ফ্রি ডেলিভারির দিন শেষ! পকেটে টান ফেলল জেপ্টো, জোমাটোর খাবার অর্ডার করতেও এবার পোহাতে হবে বাড়তি যন্ত্রণা

অনলাইন কেনাকাটা এবং কুইক-কমার্স পরিষেবার দুনিয়ায় গ্রাহকদের জন্য একের পর এক বড় ধাক্কা আসতে শুরু করেছে। উৎসবের মরশুমের ঠিক আগে ডেলিভারি চার্জ এবং অতিরিক্ত ফি সংক্রান্ত নিয়মে বড়সড় বদল এনেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় কুইক-কমার্স প্ল্যাটফর্ম জেপ্টো (Zepto)। এতদিন পর্যন্ত সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী ১৪৯ টাকার ন্যূনতম কেনাকাটা করলেই গ্রাহকরা ফ্রি ডেলিভারির সুবিধা পেতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক নীতি পরিবর্তনে সেই সর্বনিম্ন অর্ডারের সীমা সরাসরি বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে কোনো বাড়তি ডেলিভারি চার্জ ছাড়াই পণ্য ঘরে পেতে হলে গ্রাহককে অন্তত ১৯৯ টাকার কেনাকাটা করতেই হবে। অন্যথায় অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ পকেট থেকে খরচ করতে হবে। শুধু তাই নয়, বাজারের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে বা পিক আওয়ারে (Peak Hours) এই ন্যূনতম অর্ডারের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে ২৯৯ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। জেপ্টোর এই নীতি বদলের ফলে সংস্থার ফ্রি ডেলিভারি স্ট্র্যাটেজি এখন সরাসরি ব্লিংকিট (Blinkit) এবং ইনস্টামার্টের (Instamart) মতো প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাগুলোর সমান্তরালে চলে এসেছে। এর ফলে যারা প্রতিদিনের ছোটখাটো জরুরি জিনিসপত্র অর্ডারের জন্য এই অ্যাপগুলির ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক বাজেটে বেশ ভালোমতো টান পড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনলাইন ফুড ডেলিভারি জায়ান্ট জোমাটোও (Zomato) তাদের প্ল্যাটফর্ম ফি বাড়িয়ে প্রায় ১৪.৯০ টাকা করেছে, যা অতীতে ছিল মাত্র ১২.৫০ টাকা।

হঠাৎ কেন এমন কঠোর ও ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নিল এই সমস্ত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলি? শিল্পমহল ও বিভিন্ন আর্থিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, এই সংস্থাগুলি এখন আর শুধুমাত্র অর্ডারের সংখ্যা বা ইউজার বেস বাড়ানোর পুরনো ইঁদুরদৌড়ের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। বরং প্রতিটি ডেলিভারির লজিস্টিকস এবং অপারেশনাল খরচ কমানোর জন্য এভারেজ অর্ডার ভ্যালু (Average Order Value) বা গড় কেনাকাটার পরিমাণ বাড়ানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, কোনো গ্রাহক যখন খুব কম টাকার অর্ডার করেন, তখন সেই নির্দিষ্ট অর্ডারের প্যাকেজিং, রাইডারের পারিশ্রমিক এবং কোল্ড চেইন বা ওয়্যারহাউসের খরচ তোলা সংস্থার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নতুন এই নিয়মের ফলে গ্রাহকরা বিনামূল্যে ডেলিভারি পাওয়ার লোভে কার্টে আরও বেশি পণ্য যোগ করতে বাধ্য হবেন, যা পরোক্ষভাবে সংস্থার ডেলিভারি খরচ অনেকটাই কমিয়ে আনবে।

তবে এখানেই শেষ নয়, জেপ্টোর পর এবার অনলাইন ফুড ডেলিভারি আরও অনেক বেশি ব্যয়বহুল হতে চলেছে সাধারণ মানুষের জন্য। জোমাটোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, খাবার অর্ডার করার খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু কেন এই মূল্যবৃদ্ধি? এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জোমাটো লিমিটেডের চিফ সাসটেইনেবিলিটি অফিসার অঞ্জলি রবি কুমার জানিয়েছেন যে, পরিবেশ দূষণ রোধ করতে আগামী দিনে প্লাস্টিকের ক্ষতিকারক প্যাকেজিং থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে পরিবেশবান্ধব বা ইকো-ফ্রেন্ডলি (Eco-friendly) বিকল্প প্যাকেজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে এই সমস্ত সংস্থা। বর্তমান ব্যবস্থায় বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ ও ক্লাউড কিচেন খাবার সরবরাহের জন্য প্লাস্টিক বা থার্মোকলের পাত্র ব্যবহার করে থাকে, যার প্যাকেজিং খরচ সাধারণত অর্ডারের মোট মূল্যের প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি হয় এবং সেই বাড়তি খরচ ঘুরিয়ে গ্রাহককেই বহন করতে হয়।

সংস্থার পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, পরিবেশ রক্ষার্থে প্লাস্টিক প্যাকেজিং বর্জন করে যদি অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল, ব্যাগাস (আখের ছিবড়ের তৈরি পাত্র), কাগজ বা মাটির থালার মতো পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করা হয়, তবে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে এর আকাশছোঁয়া উৎপাদন মূল্য। প্রথাগত প্লাস্টিকের পাত্রের তুলনায় এই ধরনের ইকো-ফ্রেন্ডলি বা বায়োডিগ্রেডেবল উপকরণের দাম অনেকটাই বেশি হওয়ায় সরাসরি তার প্রভাব এসে পড়াবে সাধারণ ক্রেতার পকেটে। কারণ এই বাড়তি খরচের বড় একটা অংশ বহন করতে হবে ক্রেতাদেরই। সব মিলিয়ে, ঘরে বসে এক ক্লিকে খাবার বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস অর্ডার করার জমানায় এবার পকেট ফাঁকা হওয়ার জোগাড় হয়েছে।