৬,২৮২ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট! খরা কাটিয়ে কীভাবে বদলে যাচ্ছে পূর্ণিয়া ও কিষাণগঞ্জের কৃষিচিত্র?

সীমাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। এককালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার প্রতীক কোসি নদীর নাম শুনলেই এতদিন চোখের সামনে ভেসে উঠত ভাঙন, জলমগ্ন জনপদ আর ফসল নষ্টের হাহাকার। কিন্তু এবার সেই ধ্বংসাত্মক কোসি নদীরই উদ্বৃত্ত জল সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সীমাঞ্চলের বিশাল কৃষিজমিতে সেচ পৌঁছে দেওয়ার এক যুগান্তকারী ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে চলেছে। কোসি-মেচি আন্তঃরাজ্য নদী সংযোগ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নিয়ন্ত্রিত উপায়ে কোসি নদীর অতিরিক্ত জল মেচি নদীতে প্রবাহিত করা, যা পূর্ণিয়া, আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ এবং কাটিহার জেলার লক্ষাধিক কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে প্রস্তুত।

দীর্ঘদিন ধরে কোসি নদীর তীব্র বন্যা সীমাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শত শত একর উর্বর কৃষিজমি জলের নিচে তলিয়ে যাওয়া এবং তীব্র নদীর ভাঙনে বহু জমি চিরতরে নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ার ঘটনা নিত্যদিনের বাস্তবতা ছিল। তবে বর্তমান প্রশাসন সেই ধ্বংসলীলা সৃষ্টিকারী জলরাশিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে কৃষি ও গ্রামীণ সমৃদ্ধির শক্তিতে রূপান্তর করার ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রায় ৬,২৮২.৩২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বিশাল প্রকল্পটির নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য জোরকদম প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সম্প্রতি নির্মাণাধীন এই প্রজেক্টের কাজ সরেজমিনে খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের নির্ধারিত সময়সীমা এবং কাজের গুণমানের ওপর বিশেষ নজর দেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন নীতি নির্ধারকরা।

এই প্রকল্প সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২,১৪,৮১৩ হেক্টর নতুন ও উর্বর কৃষিজমিতে অতিরিক্ত ও নিশ্চিত সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন পূর্ণিয়া, আরারিয়া, কিষাণগঞ্জ এবং কাটিহার জেলার কোটি কোটি খেতমজুর ও চাষি ভাইরা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একাকী পূর্ণিয়ায় প্রায় ৬৯,৯৭০ হেক্টর, আরারিয়ায় ৬৯,৬৪২ হেক্টর, কিষাণগঞ্জে ৩৯,৫৪৮ হেক্টর এবং কাটিহারে প্রায় ৩৫,৬৫৩ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচের জল পৌঁছে যাবে। এর ফলে বৃষ্টির ওপর কৃষকদের চিরাচরিত নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং পর্যাপ্ত জল সরবরাহের সুবাদে কৃষকরা জমিতে একাধিক ফসল ফলানোর সুযোগ পাবেন। এই মহাপ্রকল্পের অধীনে পূর্ব কোসি প্রধান খালের জল সরবরাহ ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ১৫,০০০ কিউসেক থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ কিউসেক করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, চারটি প্রধান শাখা খাল, ছটি সুবিন্যস্ত বিতরণী খাল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে প্রায় ৯৫০ কিউসেক জল মেচি নদীতে প্রবাহিত করা সম্ভব হবে।

বন্যার জলকে অভিশাপ থেকে শক্তিতে রূপান্তর করার এই সুদূরপ্রসারী ভাবনা সীমাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক চিত্র পাল্টে দিতে প্রস্তুত। কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা প্রদান করতে গিয়ে যাতে চাষের কোনো রকম ক্ষতি না হয়, সেদিকেও প্রশাসন সতর্ক দৃষ্টি রাখছে। পর্যাপ্ত জলের জোগান নিশ্চিত হওয়ায় শস্য আবর্তনে বৈচিত্র্য আসবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরাসরি এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সব মিলিয়ে, কোসি-মেচি সংযোগ প্রকল্প কেবল একটি সাধারণ সেচ বা খাল খনন প্রকল্প নয়, এটি সমগ্র কোসি-সীমাঞ্চল অঞ্চলের জল ব্যবস্থাপনা ও কৃষি উন্নয়নের এক বিরাট মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে।