চিনকে চাপে রেখে মোদী জমানায় আরও কাছে এল ভারত-জাপান! মুম্বইতে পা রেখে কী বার্তা দিলেন কোইজুমি?

ভারত ও জাপানের মধ্যে কৌশলগত এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে দু’দিনের সরকারি সফরে ভারতে এসে পৌঁছেছেন জাপানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি। বুধবার মুম্বইতে পা রাখার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে তাঁর এই ঐতিহাসিক প্রথম ভারত সফর। এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দু রয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সমুদ্র-নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দুই বন্ধুভাবাপন্ন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া। মুম্বই পৌঁছানোর পর প্রথাগতভাবে ওয়েস্টার্ন নেভাল কমান্ডে গার্ড অফ অনার পরিদর্শন করেন তিনি। এরপর নেভাল ডকইয়ার্ডের গৌরব স্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান জাপানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

মুম্বই সফরে নৌ-সহযোগিতায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সফরের অংশ হিসেবে জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারতের আত্মনির্ভর ভারতের প্রতীক তথা দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি স্টিলথ ডেস্ট্রয়ার আইএনএস চেন্নাই সরেজমিনে ঘুরে দেখেন। এরপরেই তিনি ভারতীয় নৌসেনা প্রধান অ্যাডমিরাল কৃষ্ণা স্বামীনাথন এবং ওয়েস্টার্ন নেভাল কমান্ডের ফ্ল্যাগ অফিসার কমান্ডিং-ইন-চিফ, ভাইস অ্যাডমিরাল সঞ্জয় মহাজন ভৎসায়নের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জাপানি প্রতিনিধিদলকে ভারতীয় নৌসেনার অপারেশনাল ক্ষমতা, বহুমুখী ভূমিকা এবং এই অঞ্চলের ভূ-কৌশলগত দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবগত করা হয়েছে। ভারতে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত কেইচি ওনো তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে পোস্ট করে এই সফরের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেছেন।

মুম্বই পর্বের পর সফরের দ্বিতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসছেন কোইজুমি। এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি বজায় রাখা এবং দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও গভীরতর করা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে প্রকাশ, এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনার ফলে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত বিশ্বাস বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং সহযোগিতার নতুন ও অভিনব ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘মেক-ইন-ইন্ডিয়া’ নীতির আওতায় যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন এবং প্রযুক্তিগত হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাপান তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর সংক্রান্ত নীতিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এনেছে, যার ফলে এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও জাপান উভয়েই একটি মুক্ত, অবাধ, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল গঠনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাইচি ১৬তম বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সেই বৈঠকে দুই পক্ষই প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বহুগুণ বাড়াতে ঐক্যবদ্ধভাবে সম্মত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব শক্তিতে বিশাল অংকের বিনিয়োগের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাপানি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই দুই দিনের সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান গতিশীলতাকে যেমন স্পষ্ট করে তোলে, তেমনই আগামী দিনে দুই দেশের অংশীদারিত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করবে বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।

Riya Chakrabarty
  • Riya Chakrabarty