সামান্য এক মশা কেড়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ! বিশ্বের কোন কোন দেশ পরিণত হয়েছে সাক্ষাৎ ‘ম্যালেরিয়া বলয়’-এ?

বিশ্বের বহু দেশের কাছে মশা আজ কোনো সাধারণ পতঙ্গ নয়, বরং সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে ৮০টি দেশে প্রায় ৬ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে শুধুমাত্র ম্যালেরিয়ার মতো ভয়াবহ রোগের শিকার হয়ে। এর একটি বড় অংশই ঘটেছে আফ্রিকার বিভিন্ন জনবহুল রাষ্ট্রে। আমেরিকার বিশিষ্ট স্বাস্থ্য সংস্থা সিডিসি (CDC)-ও মশাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কারণ এটি কেবল ম্যালেরিয়াই ছড়ায় না, বরং ডেঙ্গু, জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং আরও বহু প্রাণঘাতী রোগের প্রধান বাহক হিসেবে মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। মশার কামড়ে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে আফ্রিকার প্রধান দেশ নাইজেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনে।
‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনে প্রতি এক লক্ষ মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার প্রায় ১৩১ জন। অন্যদিকে, নাইজারে এই ভয়াবহ হার প্রতি এক লক্ষ মানুষে ১১৫ জন। তবে এই সংকট কেবল এই দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; আফ্রিকার মোট ছয়টি দেশকে একসঙ্গে গোটা বিশ্বের ‘ম্যালেরিয়া বলয়’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিশেষ দেশগুলির তালিকায় রয়েছে সিয়েরা লিওন, নাইজার, বুরুন্ডি, বেনিন, নাইজেরিয়া এবং বুরকিনা ফাসো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, সারা বিশ্বে ম্যালেরিয়ায় যত মানুষের মৃত্যু হয়, তার প্রায় ৯৫ শতাংশই ঘটে একাই আফ্রিকান মহাদেশে। আরও মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই মৃত্যুর প্রায় ৭৫ শতাংশই ঘটে পাঁচ বছরের কম বয়সি নিষ্পাপ শিশুদের মধ্যে। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন আফ্রিকার দেশগুলিতে মশাবাহিত মৃত্যুর এই ভয়ানক প্রকোপ দেখা যায়? এর পেছনে মূলত দায়ী ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত পরিস্থিতি। সিয়েরা লিওন, নাইজার এবং নাইজেরিয়ার মতো নিরক্ষীয় ও ক্রান্তীয় দেশগুলিতে সারা বছর ধরে তাপমাত্রা সাধারণত ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ঘোরাফেরা করে, যা মশার প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির জন্য একদম আদর্শ।
সাধারণত পরিবেশের তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে মশার বংশবৃদ্ধি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আফ্রিকার ক্ষেত্রে এই অনুকূল আবহাওয়া বছরজুড়েই বজায় থাকে। এর পাশাপাশি, আফ্রিকার দেশগুলিতে বাতাসে আর্দ্রতা বা হিউমিডিটির মাত্রা প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত উর্ধ্বমুখী থাকে, যা মশার দ্রুত প্রজনন এবং দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্য এক উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়। এই চরম আর্দ্র এবং উষ্ণ আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে মশার উপদ্রব বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তা মহামারী রূপ ধারণ করে।