মনমোহন সিংহের সেই ঐতিহাসিক বাজেটেই কি বদলে গেল ভারতের ভাগ্য? জেনে নিন সেনসেক্সের শূন্য থেকে শিখরে পৌঁছানোর চাঞ্চল্যকর গল্প!

ভারত স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষ উদযাপনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে গত ৭৯ বছরের এক অবিস্মরণীয় অর্থনৈতিক রূপান্তরের সাক্ষী থাকছে। দেশের অর্থনৈতিক যাত্রার এই মহাচিত্রটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ভারতীয় শেয়ার বাজারে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালের যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের (বিএসই) সূচক সেনসেক্স যে আকাশচুম্বী গতি অর্জন করেছে, তা আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে বিরল। ১৯৯১ সালে যখন ভারত এক অভূতপূর্ব ও গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন সেনসেক্স ১,০০০ অঙ্কেরও অনেক নিচে লেনদেন করছিল। তবে দেশের সেই সংকটলগ্নে গৃহীত এলপিজি তথা উদারীকরণ, ব্যক্তিকরণ এবং বিশ্বায়নের নীতি ভারতের অর্থনীতির দিক ও গতি সম্পূর্ণ বদলে দেয়, যার সুদূরপ্রসারী ও প্রবল ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি এসে পড়ে শেয়ার বাজারে। বর্তমান সময়ে সেনসেক্স প্রায় ৭৮,০০০ স্তরের আশেপাশে অবস্থান করছে। এর অর্থ দাঁড়ায় যে, ১৯৯১ সালের সেই আদি স্তর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সেনসেক্স প্রায় ৮,৫০০ শতাংশের অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি নথিভুক্ত করেছে। এই বিশাল অগ্রগতি প্রায় ৩৫ বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় প্রায় ১৪ শতাংশ বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি হারের সমতুল্য, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য এক অভাবনীয় লাভের বার্তা বয়ে এনেছে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ১৯৯১ সালে ভারতের সামনে এক অত্যন্ত ভয়াবহ ও গভীর অর্থনৈতিক সংকট উপস্থিত হয়েছিল। সেনসেক্সের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সালের জানুয়ারি মাসে, কিন্তু তার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই ভারত এক গুরুতর বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন সময়ে দেশের কাছে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সংরক্ষিত ভাণ্ডার অবশিষ্ট ছিল, তা দিয়ে বড়জোর মাত্র দু’সপ্তাহের আমদানির খরচ মেটানো সম্ভবপর হতো। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর ও সংকটপূর্ণ মুহূর্তে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে এক ঐতিহাসিক বাজেট পেশ করেন। এই যুগান্তকারী বাজেটের হাত ধরেই ভারত দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা আমলাতান্ত্রিক ‘লাইসেন্স রাজ’-এর নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসার এবং দেশের অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করার পথে এক সুদূরপ্রসারী সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সরকার একযোগে বেসরকারি খাতের অবাধ বিস্তার এবং বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সমস্ত বন্ধ দরজা খুলে দেয়। সেই বিশেষ ঐতিহাসিক সময়েই উদারীকরণ, ব্যক্তিকরণ ও বিশ্বায়নের নীতিগুলো সর্বাত্মক গতি লাভ করে, যা ভারতীয় অর্থনীতির ভিত্তিপ্রস্তরকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
বাজেট পেশের ঠিক সেই ঐতিহাসিক দিনেই সেনসেক্স প্রায় ৫ শতাংশ ঊর্ধ্বমুখী হয়ে সকলের নজর কাড়ে। শুধু তাই নয়, গোটা ১৯৯১ সাল জুড়ে এই সূচক প্রায় ৮২ শতাংশের চোখধাঁধানো রিটার্ন প্রদান করে এবং বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে এটি ১,৯০৯ অঙ্কের শক্তিশালী স্তরে গিয়ে পৌঁছায়। এই দুর্দান্ত সূচনার পরেও শেয়ার বাজারে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত থাকে। পরবর্তীকালে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ড. মনমোহন সিংহের পরবর্তী বাজেট পেশ হওয়ার আগের প্রায় সাত মাসের মধ্যেই সেনসেক্স প্রায় ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত লাফিয়ে উঠেছিল। তবে এই পর্যায়ে বাজারের এই অস্বাভাবিক ও প্রবল গতির পেছনে আরও বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কারণ সক্রিয় ছিল। বিশেষ করে শেয়ার বাজারে তৎকালীন সময়ে প্রখ্যাত ব্রোকার হরসাদ মেহতার কারসাজিতে যে অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম তেজি ভাব তৈরি হয়েছিল, তা এই উল্লম্ফনেরই একটি অন্ধকার ও আলোচিত অংশ ছিল।
১৯৯২ সালের মার্চ মাসে সেনসেক্স প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক ৪,০০০ অঙ্কের গণ্ডি সফলভাবে অতিক্রম করে। কিন্তু এই সাফল্যের রেশ কাটতে না কাটতেই বাজারে এক তীব্র ও বিপর্যয়কর ধস নামে। ১৯৯২ সালের ২৮শে এপ্রিল সেনসেক্স এক ধাক্কায় প্রায় ১৩ শতাংশ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক তৈরি করেছিল। ঠিক এই সংবেদনশীল মুহূর্তেই বহুল আলোচিত হরসাদ মেহতার আর্থিক কেলেঙ্কারি সর্বসমক্ষে প্রকাশ পায় এবং ভারতীয় শেয়ার বাজারের তৎকালীন অবিশ্বাস্য গতির রথে হঠাৎ করেই এক বিরাট ও আকস্মিক যবনিকা পতন ঘটে। এই বড় ধাক্কার পর ভারতীয় শেয়ার বাজার পরবর্তীতে বহু চড়াই-উতরাই, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক সংকটের মুখোমুখি হয়। তা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রক্রিয়া এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি এবং সামগ্রিকভাবে ভারতীয় অর্থনীতির আকার ও পরিধি ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি এই ধারাবাহিকতার সম্পূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব পরিশেষে গিয়ে সরাসরি উপকৃত করেছে দেশের শেয়ার বাজারকে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালটি সামগ্রিকভাবে সেনসেক্সের দীর্ঘ ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিশেষ ও স্মরণীয় বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই একক বছরেই সূচকটি ৭৫,০০০, ৮০,০০০ এবং ৮৫,০০০-এর মতো তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মনস্তাত্ত্বিক স্তর সাফল্যের সঙ্গে পার করে এক নতুন উচ্চতা সৃষ্টি করে। একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, ২০১৪ সালে সেনসেক্স যেখানে মোটে ২৫,০০০ অঙ্কের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিল, তা অবিশ্বাস্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালের মধ্যে ৮৬,০০০ স্তরের খুব কাছাকাছি গিয়ে পৌঁছায়। বিগত বছরের ডিসেম্বর মাসে সেনসেক্স তার ঐতিহাসিক ৮৬,০০০-এর ল্যান্ডমার্ক বা অঙ্কটি সফলভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও এর ঠিক পরেই আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু সংশোধনের কারণে বাজারে কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা ও সংশোধন দেখা দেয়। বর্তমানে সেনসেক্স তার সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্তর থেকে প্রায় ১০ শতাংশ নিচে নেমে এসে বর্তমানে ৭৮,০০০ অঙ্কের আশেপাশে স্বস্তিদায়ক লেনদেন বজায় রেখেছে।
ভবিষ্যতের দিক তাকালে, বর্তমান বৈশ্বিক বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি কেন্দ্রিক অতি-উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের লাগাতার ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও যুদ্ধের পরিবেশের মতো একাধিক গুরুতর কারণে ভারতীয় শেয়ার বাজারে সাময়িক ও দৃশ্যমান চাপ তৈরি হয়েছে। তা সত্ত্বেও দেশের বহু প্রবীণ ও অভিজ্ঞ বাজার বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদরা ভারতীয় শেয়ার বাজারের সুদূর ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী ও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ কয়েক দশকের চক্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির প্রভাব, সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান শেয়ার বাজার মুখী অংশগ্রহণ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির মজবুত ও বহুমুখী গ্রোথ ভারতীয় বাজারের মূল ভিতকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে তুলেছে। তাঁরা দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা স্বচক্ষে সেনসেক্সকে ১০০ থেকে শুরু করে আজকের ৮৬,০০০-এর বিশাল শিখরে পৌঁছাতে দেখেছেন এবং তাঁরা পূর্ণ আশাবাদী যে আগামী দশকগুলোতেও এই সূচকের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রযাত্রার এই গৌরবোজ্জ্বল ও সোনালী পথচলা সমানভাবে অব্যাহত থাকবে।