ডাকঘর থেকে রেল, ঘুষ চাইলেই সোজা যোগাযোগ করুন সিবিআইয়ের সঙ্গে! বড় পদক্ষেপে থরথর দুর্নীতিবাজরা

ডাকঘর, রেলওয়ে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ ঘুষ নিলেই এবার সরাসরি সিবিআইকে (CBI) জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিতে এবার এই অভিনব প্রচারে নেমে পড়েছে খোদ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী এজেন্সি সিবিআই। সম্প্রতি কলকাতার নিজাম প্যালেসে এই মর্মে বিশেষ সতর্কতামূলক পোস্টার সাঁটানো হয়েছে, যাতে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে—‘ঘুষ দেবেন না’। কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নিজাম প্যালেসে লাগানো ওই পোস্টারগুলিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি—এই তিনটি প্রধান ভাষায় বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে যে, ব্যাঙ্ক, ডাকঘর, রেলওয়ে কিংবা দেশের অন্যান্য যেকোনো কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানে যদি কোনো কর্মী বা আধিকারিক সাধারণ মানুষের থেকে অবৈধভাবে ঘুষ দাবি করেন, তবে যেন সঙ্গে সঙ্গে সিবিআইকে খবর দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ যাতে খুব সহজেই যোগাযোগ করতে পারেন, তার জন্য নির্দিষ্ট অফিসিয়াল ইমেল আইডি এবং জরুরি যোগাযোগের ফোন নম্বরও ওই পোস্টারে প্রকাশ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই প্রশাসনিক ব্যবস্থার চিত্রটা বদলাতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে এক নতুন ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতে দীর্ঘ আট বছর আগে অর্থাৎ ২০১৮ সালে তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে রাজ্যে সিবিআইয়ের ওপর আইনি লাগাম টানা হয়েছিল এবং সাধারণ তদন্তের ক্ষেত্রে একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আট বছর পর সেই পুরোনো বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে রাজ্যের নতুন সরকার। যার ফলে এখন থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মী কিংবা যেকোনো কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে যুক্ত কোনো অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করতে পারবে সিবিআই। এর জন্য রাজ্য সরকারের তরফ থেকে আলাদা করে আর কোনো পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না।

ঠিক এইরকম এক কঠোর ও অস্বস্তিকর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আবহেই যাতে কোনো কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিক বা নিচুতলার কর্মী সাধারণ মানুষের থেকে অনৈতিকভাবে ঘুষ নেওয়ার সাহস না পায়, তার জন্য ময়দানে নেমেছে সিবিআই। দুর্নীতি প্রতিরোধে এই কড়া নজরদারি সাধারণ নাগরিকদের স্বস্তি দিচ্ছে।

উল্লেখ্য, ইতিমধ্যিেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও তোলাবাজি এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতার নীতি গ্রহণের জোরালো আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এমনকি রাজ্যের দুর্নীতি দমন শাখার পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশেষভাবে পোস্ট করে জানানো হয়েছে যে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা আধিকারিক ঘুষ চাইলে যেন অবিলম্বে টোল ফ্রি নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। নির্দিষ্ট অভিযোগ জানানোর জন্য 9836233891 হেল্পলাইন নম্বরও চালু করা হয়েছে।

ইতিমধ্যেই এই কড়া ব্যবস্থার সুফলও হাতেনাতে মিলতে শুরু করেছে। কদিন আগেই রাজ্যের দুর্নীতি দমন শাখার বিশেষ দল এক সরকারি আধিকারিককে হাতেহাতে ঘুষ নিতে গিয়ে একেবারে ফাঁদ পেতে ধরে ফেলেছিল। পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, একটি গ্রামীণ সাব-হেলথ সেন্টার নির্মাণের বিপুল বকেয়া বিল মঞ্জুর করে দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার বিমল সাহা এক ঠিকাদারের কাছে সরাসরি ২ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। এই অনৈতিক দাবির পরেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে সরাসরি রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখায় লিখিত অভিযোগ জানান ওই ভুক্তভোগী ঠিকাদার।

অভিযোগ পাওয়ার পরেই দুর্নীতি দমন শাখার আধিকারিকরা অত্যন্ত সুচারুভাবে এক গোপন ফাঁদ পাতেন। পরিকল্পনামাফিক একেবারে ছদ্মবেশ ধারণ করে পুলিশের বিশেষ দল নির্দিষ্ট সময়ে বিডিও অফিসে গিয়ে উপস্থিত হয়। ঘুষের সেই টাকার বান্ডিলের মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিশেষ রাসায়নিক বা কেমিক্যাল মাখিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাধারণত এই ধরনের দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে ‘ফেনলফথালিন টেস্ট’ বা রাসায়নিক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে হাতেনাতে অপরাধ প্রমাণ করা হয়। আর ঠিক এই ফাঁদেই একেবারে মাথা ঘুরে যায় সেই দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকের। তিনি যখন হাসিমুখে সেই ঘুষের টাকা নিজের হাতে নিতে যান, মুহূর্তের মধ্যে কেমিক্যালের কারণে তাঁর দুই হাতে সেই নির্দিষ্ট রঙের ছোপ লেগে যায়। এরপরই দুর্নীতি দমন শাখার অফিসাররা তাঁকে হাতেনাতে পাকড়াও করেন এবং পরবর্তীতে প্রমাণের জন্য তাঁর হাত রাসায়নিক মেশানো জলে চোবানো মাত্রই জলের রঙ পরিবর্তন হয়ে গাঢ় গোলাপি বর্ণ ধারণ করে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের এই নতুন পোস্টার প্রচার এবং রাজ্য দুর্নীতি দমন শাখার এমন সাঁড়াশি অভিযান একসঙ্গে মিলিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি মহলে এখন চরম কম্পন ধরিয়ে দিয়েছে।