৩০ পেরোলেই কি জাঁকিয়ে বসছে অ্যালঝাইমার্স? সাধারণ ভুলে যাওয়া আর মারাত্মক রোগের আসল তফাত জানুন

বয়স ৩০ পেরোলেই আমরা প্রায়শই একটা পরিচিত কথা খুব অবলীলায় বলে থাকি, “আগের মতো আর এখন কিছুই মনে থাকে না।” চাবি ঠিক কোথায় রাখলাম, কিছুক্ষণ আগে কার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, কিংবা হঠাৎ করে কারো নাম মাথা থেকে উবে যাওয়া—সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যায়। বর্তমানের লাগাতার মানসিক চাপ, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং ফোনের অন্তহীন নোটিফিকেশনের যুগে ব্রেন ওভারলোড হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘বেনাইন ফরগেটফুলনেস’ বলা হয়, যা নিয়ে ভয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু কিছু ভুলে যাওয়া এমন রয়েছে, যা আমাদের শরীর ও মস্তিষ্কের ভেতর থেকে দেওয়া এক ধরনের গুরুতর সতর্কবার্তা। সেগুলোকে সাধারণ ‘ভুলোমন’ বলে উড়িয়ে দিলে অদূর ভবিষ্যতে বড় বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে।

কোন ভুলে যাওয়া একদম স্বাভাবিক? দৈনন্দিন জীবনে কোন বিষয়গুলো নিয়ে অহেতুক আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তা পরিষ্কার করা জরুরি। যেমন—কারো নাম তাৎক্ষণিকভাবে মনে না পড়া কিন্তু পাঁচ মিনিট পর নিজে থেকেই মনে পড়ে যাওয়া, চশমাটা কোথায় রাখলেন তা কিছুক্ষণের জন্য খুঁজে না পাওয়া, ব্যস্ততার চাপে কোনো জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা ভুলে যাওয়া কিন্তু ক্যালেন্ডার দেখলেই তা আবার মনে পড়ে যাওয়া, কিংবা কথা বলতে বলতে হঠাৎ একটা নির্দিষ্ট শব্দ মনে করতে না পেরে “ওই যে ওইটা” বলে চালিয়ে দেওয়া। বয়স বাড়লে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কিংবা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা থাকলে এমনটা হতেই পারে। মূলত এক্ষেত্রে ব্রেনের হার্ডডিস্ক কিছুটা স্লো হয়ে যায় মাত্র, সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায় না।

তবে কোন ৫টি লক্ষণ দেখলে অবিলম্বে সাবধান হওয়া উচিত? যখন এই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা আপনার দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে শুরু করে, ঠিক তখনই তা গভীর চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমত, অত্যন্ত পরিচিত কোনো কাজ হঠাৎ করে সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া। যেমন—রোজ যে চেনা রাস্তা দিয়ে আপনি অফিসে যাতায়াত করেন, সেই রাস্তা হঠাৎ হারিয়ে ফেলা কিংবা বছরের পর বছর ধরে রান্না করা কোনো চেনা রান্নার রেসিপি হঠাৎ সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া।

দ্বিতীয়ত, যেকোনো সাধারণ কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ খেই হারিয়ে ফেলা। কথা বলতে বলতে মাঝপথে ভুলে যাওয়া যে আপনি ঠিক কী বলছিলেন, কিংবা একই প্রশ্ন খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার করা।

তৃতীয়ত, ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব উল্টপাল্টা ও অদ্ভুত জায়গায় রাখা। যেমন—টিভির রিমোট কন্ট্রোলটি ফ্রিজের ভেতরে রেখে দেওয়া, অথবা টাকা বইয়ের পাতার ভাঁজে লুকিয়ে রেখে পরে নিজেই ভুলে যাওয়া যে সেটি কোথায় রাখা হয়েছে।

চতুর্থত, সময় এবং ভৌগোলিক অবস্থান বা জায়গা সম্পর্কে সম্পূর্ণ গুলিয়ে ফেলা। আজকের দিনটি কী বার বা তারিখ কত, তা কিছুতেই বুঝতে না পারা কিংবা নিজের চেনা বাড়িতেই কোন ঘরটি কোন কাজের জন্য তৈরি, তা নিয়ে চরম বিভ্রান্তিতে ভোগা।

পঞ্চমত, নিজের মেজাজ, আচরণ এবং সার্বিক পার্সোনালিটিতে বড় ধরনের বদল আসা। হঠাৎ করে খুব বেশি সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠা, ঘরের অতি কাছের মানুষকেও চিনতে না পেরে বিভ্রান্ত হওয়া এবং অত্যন্ত সহজ কোনো কাজ করতে গিয়েও প্রচণ্ড ভয় পাওয়া।

তাহলে এমতাবস্থায় আপনার ঠিক কী করা উচিত? কোনো কিছু দেখেই অযথা ভয় পেয়ে গুগল করে “আমার কি আলঝাইমার্স রোগ হলো?” এমন আশঙ্কা করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন। সবার আগে নিজের জীবনযাত্রার মান উন্নত করুন। নিয়ম করে রাতে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন, প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট নিয়ম করে হাঁটুন, মুঠোফোনের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে দিন এবং নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন—যেমন নতুন কোনো ধাঁধা সমাধান করা, গান শোনা বা নতুন ভাষা শেখা। এগুলি সবই আপনার মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের জিম বা এক্সারসাইজ হিসেবে কাজ করে।

যদি ওপরের উল্লিখিত ৫টি বিপজ্জনক লক্ষণের মধ্যে অন্তত ২ থেকে ৩টি লক্ষণ লাগাতার ৩ মাস ধরে আপনার মধ্যে লক্ষ্য করেন, তবে সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে একজন দক্ষ নিউরোলজিস্ট বা অভিজ্ঞ জেনারেল ফিজিশিয়ানের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকরা কিছু সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা এবং রক্তের কিছু রুটিন টেস্টের মাধ্যমে দেখে নেবেন যে এই সমস্যাগুলো শরীরে ভিটামিন বি-১২ এর ঘাটতি, থাইরয়েডজনিত সমস্যা বা অতিরিক্ত ডিপ্রেশনের কারণে হচ্ছে কি না। মনে রাখবেন, সঠিক সময়ে পদক্ষেপ নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। কারো নাম ঠিকমতো মনে না পড়ার অর্থ এই নয় যে আপনার স্মৃতিশক্তি চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। মানব শরীর বা ব্রেন ঠিক আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতোই একটু বিশেষ যত্ন ও সতর্কতা কামনা করে। তাই জীবনের অতিরিক্ত মানসিক চাপ ঝেটিয়ে ফেলুন, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন, আশেপাশের মানুষের সঙ্গে প্রাণ খুলে গল্প করুন। আর হ্যাঁ, ঘরে চাবি হারানোর বদভ্যাস কাটাতে সেটিকে সবসময় নির্দিষ্ট একটি জায়গাতেই রাখার অভ্যাস করুন।