আমেরিকার চোখে চোখ রেখে চিনকে সাহায্য! ভারতের নাম জড়িয়ে চাঞ্চল্যকর বিস্ফোরক রিপোর্ট ওয়াশিংটনের

আমেরিকার ওপর চিনা পণ্যের চড়া শুল্কের খাঁড়া থেকে বাঁচতে এক বিশাল আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের পর্দাফাঁস করল মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে সম্প্রতি অত্যন্ত বিস্ফোরক এক অভিযোগ তুলে দাবি করা হয়েছে যে, বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরক্ষভাবে চিনকে মার্কিন শুল্ক ফাঁকি দিতে গোপনে সহায়তা করে চলেছে। আর এই বিতর্কিত দেশগুলির তালিকার ভেতরেই নাম রয়েছে ভারতেরও। ওয়াশিংটনের তরফ থেকে এই পুরো নেটওয়ার্কটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ভাষায় ‘শ্যাডো ট্রান্স-শিপমেন্ট নেটওয়ার্ক’ বা ছায়া স্থানান্তর নেটওয়ার্ক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও উৎপাদন বিষয়ক বিশিষ্ট উপদেষ্টা পিটার নাভারো ‘দ্য গ্রেট ট্রান্সশিপমেন্ট স্ক্যাম’ শিরোনামে একটি চাঞ্চল্যকর বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। তাঁর মূল দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন তৃতীয় বিশ্বের এবং উন্নয়নশীল দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে চিনা পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তিস্থল বা উৎস সম্পূর্ণ গোপন করা হচ্ছে এবং পরবর্তীতে সেই সমস্ত পণ্য অত্যন্ত সুকৌশলে মার্কিন বাজারে অবাধে প্রবেশ করানো হচ্ছে। নাভারোর কড়া বক্তব্য, বিগত ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে চিনের ওপর যে কঠোর ‘সেকশন ৩০১’ শুল্ক নীতি আরোপ করা হয়েছিল, ঠিক তার পর থেকেই এই ধরনের সন্দেহজনক ও অবৈধ ট্রান্স-শিপমেন্টের প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উক্ত রিপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, এইভাবে বেআইনি উপায়ে তৃতীয় দেশের মাফিয়া ও বাণিজ্যিক চক্রের মাধ্যমে ঘুরিয়ে মার্কিন মুলুকে পাঠানো পণ্যের বাৎসরিক আনুমানিক বাজারমূল্য কম করে ৪০ বিলিয়ন থেকে শুরু করে বিশাল অঙ্কের ৩০৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। নাভারো ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন যে, মূলত চিন থেকে আসা যেকোনো পণ্যকে মার্কিন কাস্টমসের চোখে ধুলো দিয়ে ‘নতুন দেশের পণ্য’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য তৃতীয় দেশগুলিতে সামান্য কিছু প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের গায়ে নতুন করে ভুয়া লেবেল সেঁটে দেওয়া, প্যাকেজিং বদলে ফেলা, কমার্শিয়াল ইনভয়েস বা চালান পরিবর্তন করা কিংবা সম্পূর্ণ পণ্য পরিবহণের মূল রুটটাই বদলে দেওয়া।
এর ফলে পণ্যের ভেতরের মূল চিনা উপাদান বা যন্ত্রাংশ প্রায় সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকলেও কেবল কাগজের কলমে এবং দাপ্তরিক নথিতে তার উৎপত্তিস্থল রাতারাতি বদলে যায়। মার্কিন রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে যে, চিনের সরকারি মদতপুষ্ট বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং উৎপাদকরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে কম উৎপাদন খরচ, দুর্বল কাস্টমস নজরদারি এবং আমেরিকার সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা রয়েছে এমন দেশগুলিকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। আমেরিকার কড়া শুল্কের বেড়াজাল টপকে এভাবেই চিনা পণ্য খুব সহজে মার্কিন বাজারে ঢুকে পড়ছে।
চিহ্নিত দেশগুলির এই তালিকায় মেক্সিকো, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তির নামও অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে ভারত প্রসঙ্গে মার্কিন রিপোর্টে পুনে, গুজরাট এবং চেন্নাইয়ের বিশেষ শিল্প বেল্টকে ঘিরে মারাত্মক কিছু অভিযোগ করা হয়েছে। নাভারোর সরাসরি দাবি, এই বিশেষ বেল্টগুলির মাধ্যমে চিনা পাম্প এবং ভারী কম্প্রেসর বেআইনিভাবে ভারতে ঢুকে পড়ছে এবং পরবর্তীতে সেখান থেকেই মার্কিন বাজারে রপ্তানি হচ্ছে। এর সরাসরি অভিঘাতে আমেরিকার সিনসিনাটি, ডেটন ও কলম্বাসের স্থানীয় দেশীয় শিল্পগুলি মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
নাভারো অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, “একটি চিনা পাম্প যখন ভারতের এই শিল্পাঞ্চল থেকে পুরোপুরি ভারতীয় পণ্য হিসেবে সিলমোহর পেয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়, তখন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি, ডেটন বা কলম্বাসের স্থানীয় শিল্পগুলির টিকে থাকার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।” আমেরিকার এই অর্থনৈতিক ক্ষতি রুখতে এবং এই ধরনের সন্দেহজনক ও ভুয়া পণ্য নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে এবার আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI প্রযুক্তি ব্যবহারের বড়সড় পরিকল্পনা করেছে ওয়াশিংটন।
নাভারো জানিয়েছেন যে, আগামী দিনে আমেরিকা অত্যন্ত কঠোর নজরদারির জন্য ‘ডিটেকটিভ বর্ডার’ (Detective Border) নামের সম্পূর্ণ একটি এআই-নির্ভর (AI-powered) অত্যাধুনিক ব্যবস্থা চালু করতে চলেছে। এই বিশেষ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাটি সংশ্লিষ্ট পণ্যের চালানের সমস্ত তথ্য, জটিল পরিবহণ রুট, পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস, আন্তর্জাতিক মালিকানার যোগসূত্র এবং কারখানাগুলির প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচক অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করবে। ফলে মার্কিন শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার এই আন্তর্জাতিক চক্রান্ত আগামী দিনে মারাত্মক আইনি বাধার মুখে পড়তে চলেছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা।