“খাবার অর্ডারে ফাঁদ পাতল পুলিশ!”-ইনস্টাগ্রাম বয়ফ্রেন্ডের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হল দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে পরিচয়, সেখান থেকে বন্ধুত্ব এবং পরে প্রেমের সম্পর্ক। আর সেই প্রেমই এক কিশোরীর জীবনে ডেকে আনল মারাত্মক বিপদ। টানা দুই দিন ধরে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে আটকে রেখে তাকে ধর্ষণ ও পৈশাচিক শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে এক তরুণের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যন্ত পুলিশের বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপে এবং একটি অনলাইন ফুড অর্ডারের সূত্র ধরে নাগপুর থেকে ওই কিশোরীকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগপুরে ঘটে যাওয়া এই লোমহর্ষক ঘটনায় গত মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ২০ বছর বয়সী অভিযুক্ত তরুণকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। উদ্ধার হওয়া ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরী দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং তিনি রাজ্যেরই এক জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার কন্যা।
১. ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ভুক্তভোগী কিশোরীর সঙ্গে অভিযুক্তের পরিচয় হয়েছিল ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে। পরবর্তীতে তারা স্ন্যাপচ্যাট এবং বিভিন্ন অনলাইন গেমিং প্ল্যাটফর্মেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত রোববার (২ আগস্ট), যেদিন দেশজুড়ে ‘ফ্রেন্ডশিপ ডে’ উদযাপিত হচ্ছিল। ওই দিন কিশোরী তার বাবা-মাকে জানায় যে সে এক বন্ধুর সঙ্গে শপিংমলে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তাঁরা ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে কিশোরীর মোবাইল ফোনটি বন্ধ পান। খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, সে কোনো বন্ধুর সঙ্গেই দেখা করতে যায়নি। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি ও অভিযোগ দায়ের করা হয়। পুলিশ কিশোরীর কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু করে এবং অভিযুক্তকে চিহ্নিত করে।
২. অনলাইন ফুড অর্ডার এবং পুলিশি অভিযান
তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত যুবকের নাম নির্ভয় ওরফে আকাশ মাধব পাখরে। তিনি মহারাষ্ট্রের থানে জেলার বাসিন্দা, ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনস্ট্রেশন (BBA)-এর ছাত্র এবং নাগপুরে একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। অভিযুক্তের মা একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক।
পুলিশ অভিযুক্তের মোবাইল নম্বর ট্র্যাক করে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। থানে পুলিশের একটি দল অভিযুক্তের বাড়িতে গিয়ে তার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে এবং মাকে ছেলের মোবাইলে ফোন করতে বলে। মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় অভিযুক্ত বুঝতে পারেন যে লাইনে পুলিশ অফিসারও রয়েছেন। এতে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং কিশোরীকে চাপ দিয়ে তার বাবা-মায়ের কাছে ফোন করে ‘সব ঠিক আছে’ বলে জানাতে বাধ্য করেন। ওই ফোনকলের সূত্র ধরেই পুলিশ তাদের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়।
এর কিছুক্ষণ পরেই অভিযুক্ত অনলাইনে খাবার অর্ডার করেন। পুলিশ সেই সুযোগটি লুফে নেয় এবং খাবার সরবরাহকারী (ডেলিভারি বয়)-কে সঙ্গে নিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে যায়। এরপর নাগপুর পুলিশ সেখানে নিখুঁত ফাঁদ পেতে অভিযান চালিয়ে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে।
৩. বীভৎস দৃশ্য ও পৈশাচিক নির্যাতন
পুলিশ যখন ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে, তখন ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন তদন্তকারীরা।
কিশোরী গুরুতর আহত, বিবস্ত্র এবং বিছানার সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিলেন।
অভিযুক্তের হাতে একটি ধারালো ছুরি ছিল।
কিশোরীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও গভীর ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। এমনকি তার একটি কব্জিও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়।
নাগপুর পুলিশের জোন-৪-এর উপ-কমিশনার রশ্মিতা রাও জানান, পুলিশ যদি আর সামান্য কিছু সময় দেরি করত, তবে অভিযুক্ত কিশোরীকে হত্যাই করে ফেলত। ঘটনাস্থল থেকেই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।
তদন্তে আরও জানা গেছে, অভিযুক্ত কিশোরীর কিছু অশ্লীল ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল এবং একই সঙ্গে তার পুরো পরিবারকে শেষ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়েছিল। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পকসো (POCSO) আইন, ধর্ষণ, অপহরণ ও হত্যাচেষ্টার মতো একাধিক গুরুতর ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।
৪. অভিযুক্তের আইনজীবীর দাবি ও বর্তমান পরিস্থিতি
অন্যদিকে, অভিযুক্তের আইনজীবীর দাবি— অভিযুক্ত ও কিশোরীর মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং কিশোরী নিজেই নিজের হাত কেটেছেন। তাঁর আরও দাবি, কিশোরী স্বেচ্ছায় ওই যুবকের আস্তানায় গিয়েছিলেন, ফলে এটি কোনো অপহরণের ঘটনা নয়। বর্তমানে অভিযুক্ত পুলিশ হেফাজতে রয়েছে এবং পুলিশ সূত্রে খবর, হেফাজতে থেকেও সে আরামদায়ক বিছানা ও মশার ওষুধ চাইছে।
অন্যদিকে, এই চরম ট্রমা ও মানসিক আঘাতের পর উদ্ধার হওয়া কিশোরীকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তার চিকিৎসা ও নিয়মিত মানসিক কাউন্সেলিং চলছে।