ড. ইউনুসকে প্রধান করা নিয়ে সেনাপ্রধানের আপত্তি ছিল! হাসিনা পতনের পরের গোপন রাজনৈতিক রহস্য ফাঁস করলেন আসিফ নজরুল

বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভুত্থানের মুখে দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর ধরে একছত্র আধিপত্য বজায় রেখে চলা শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই দেশজুড়ে একটি বড় প্রশ্ন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল—তাহলে এবার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান কে হতে চলেছেন? যদিও তৎকালীন পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়া অনিবার্য ছিল, তবে সেই সরকারের সর্বোচ্চ পদে কাকেই বা বসানো হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তুমুল জল্পনা ও মতবিরোধ শুরু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং সামগ্রিক কূটনৈতিক স্বীকৃতির কথা মাথায় রেখে ছাত্র প্রতিনিধিরা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম চূড়ান্ত করলেও, দেশটির সেনাবাহিনী প্রধান শুরুতে এই প্রস্তাবে সায় দিতে মোটেও রাজি ছিলেন না। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আসিফ নজরুল এক সাক্ষাৎকারে এই বিস্ফোরক দাবি করে সমস্ত রাজনৈতিক সমীকরণ ওলটপালট করে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান প্রাথমিকভাবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দিতে একেবারেই অনিচ্ছুক ছিলেন।
আসিফ নজরুল জানিয়েছেন যে, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত ২০২৪ সালের সেই রক্তক্ষয়ী ছাত্র আন্দোলনের দিনগুলিতে তিনি প্রত্যক্ষভাবে ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন এবং তাদের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতির খুব কাছাকাছি ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। আসিফ নজরুলের ভাষ্যমতে, সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের গোপন বৈঠকে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ছাত্র আন্দোলনের সাহসিকতার প্রশংসা করেন এবং দেশের ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনর্গঠনের জন্য ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কারের ওপর বিশেষ জোর দেন। কিন্তু ঠিক তার পরেই যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম সামনে আনা হয়, তখন সেনাপ্রধানকে অত্যন্ত অপ্রস্তুত ও হতবাক মনে হয়েছিল।
কিন্তু ঠিক কী কারণে সেনাপ্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করতে দ্বিধাবোধ করছিলেন? মূলত নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ ইউনূসের অতীত আইনি জটিলতা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানের মনে সুনির্দিষ্ট দুটি গুরুতর আপত্তি কাজ করছিল। প্রথমত, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রম আইন লঙ্ঘনের একটি মামলায় তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল এবং আদালত তাকে সাজা শুনিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগও আনা হয়েছিল। এই দুটি আইনি ঘটনার জেরে ড. ইউনূসের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও বিশ্বস্ততা নিয়ে সামরিক নেতৃত্বের অন্দরে কিছুটা সন্দেহের অবকাশ তৈরি হয়েছিল, যা তাদের তাৎক্ষণিকভাবে আশ্বস্ত করতে পারেনি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে কর্মীদের আইনি কল্যাণ তহবিল ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানে ব্যর্থতার অভিযোগে আদালত মুহাম্মদ ইউনূসকে ছয় মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছিল, যা পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাতিল করা হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে ড. ইউনূসসহ আরও চৌদ্দ জনের বিরুদ্ধে প্রায় বিশ লক্ষ ডলার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে নতুন মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
তবে এই সমস্ত জটিল আইনি প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কীভাবে চূড়ান্ত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস? আসিফ নজরুল দাবি করেছেন যে, তিনি নিজে সেই বৈঠকে সেনাপ্রধানকে বিস্তারিতভাবে বুঝিয়েছিলেন যে, তৎকালীন সময়ে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আনীত শ্রম আইন সংক্রান্ত বিষয় এবং অর্থ পাচারের সমস্ত অভিযোগই ছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্পষ্ট ফসল। তাঁর এই যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা ও কূটনৈতিক বোঝাপড়ার পরেই অবশেষে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আন্দোলনরত ছাত্র সমাজের চূড়ান্ত পছন্দের প্রার্থী মুহাম্মদ ইউনূসের নিয়োগের পথ প্রশস্ত করেন এবং এতে নিজের সম্মতি প্রদান করেন। বাংলাদেশের প্রভাবশালী জাতীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঠিক প্রাক্কালে সেনা সদর দপ্তরের অন্দরে চলা গোপনীয় অভ্যন্তরীণ আলোচনার এই চিত্র নজরুলের বক্তব্যে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর এই দাবি থেকে এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই ঐতিহাসিক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি প্রথমদিকে সামরিক বাহিনীর উচ্চমহল থেকে কোনো সহজ সমর্থন বা সবুজ সঙ্কেত পায়নি, বরং দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের পরেই সেনাপ্রধান নিজের আপত্তিগুলো সরিয়ে রেখে চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছিলেন।