জলে ডুবল ৫৬৩টি গ্রাম, নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ! অসমের প্রলয়ংকরী বন্যায় চরম রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে!

অসমে মনসুন এ বার কেবল বৃষ্টি নয়, নিয়ে এসেছে এক সর্বগ্রাসী ও হৃদয়বিদারক তবলার রূপ। রাজ্যজুড়ে বন্যা পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ছ’জনের মৃত্যুর জেরে চলতি বছরে বন্যায় মৃতের সংখ্যা প্রায় একশো ছুঁয়ে ফেলেছে। ১৪টি জেলার ১ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ এই জলপ্রলয়ের প্রত্যক্ষ শিকার। শত শত গ্রাম সম্পূর্ণ জলের তলায় তলিয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে রাস্তাঘাট ও সেতুগুলি। শহরাঞ্চলেও দেখা দিয়েছে তীব্র জলমন্দন, যা জনজীবনকে সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। এই চরম প্রাকৃতিক বিপদের মধ্যেই অবৈধ কয়লা ও পাথর খনি নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক কোন্দল, যা এই ট্র্যাজেডিকে এক নতুন রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে।

অসম রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের (ASDMA) সাম্প্রতিক বুলেটিন অনুযায়ী, বুধবার শিবसागर এবং বিশ্বনাথ জেলায় দু’জন করে এবং গোলাঘাট ও মরিগাঁওতে একজন করে প্রাণ হারিয়েছেন। মরিগাঁওয়ের মায়ং এলাকায় শহুরে বন্যার কবলে পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে, অন্যদিকে উদলগুড়ি জেলায় একজন নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে মঙ্গলবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ৮৯, তবে লাগাতার বৃষ্টি ও অবনতিশীল পরিস্থিতি এটিকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। শিবसागर, গোলাঘাট, জোরহাট, লখিমপুর, চড়াইদেও, বিশ্বনাথ, ধেমাজি, কামরূপ মহানগর, কার্বি আংলং, সোনিতপুর, তিনসুকিয়া, নগাঁও, দারাং এবং উদলগুড়ি—এই ১৪টি জেলা বর্তমানে বন্যার কবলে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিবसागर, যেখানে ৫৭ হাজারের বেশি মানুষ দুর্ভোগের শিকার। এরপর গোলাঘাটে প্রায় ৩৪ হাজার এবং জোরহাটে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ চরম সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছেন। মাত্র একদিন আগেও ৫টি জেলায় ১.২২ লক্ষ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল, কিন্তু অবিরাম বৃষ্টির কারণে বন্যার পরিধি দ্রুত প্রসারিত হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা আন্দাজ করা যায় এই তথ্য থেকে যে, রাজ্যের ৫৬৩টি গ্রাম সম্পূর্ণ জলমগ্ন এবং প্রায় ১৬,৯৫২ হেক্টর কৃষিজমি জলের নিচে তলিয়ে গেছে। বড় বড় সাতটি নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে, যার মধ্যে বিশ্বনাথের ব্রহ্মাঞ্জন এলাকায় পাঁচটি এবং দারাংয়ের মঙ্গলদৈতে দুটি বাঁধ রয়েছে। চড়াইদেওয়ের একটি স্টিল ব্রিজ ও উদলগুড়ির তাংলার একটি পদাতিক সেতুও ভেঙে পড়েছে। নুমাগড় এলাকায় ধানসিঁড়ি নদী এখনও বিপৎসীমার উপর দিয়ে বইছে, যা নিচু এলাকাগুলিতে নতুন বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছে। শুধু মানুষ নয়, এই বন্যায় ৩৫ হাজারের বেশি গবাদিপশু ও পোলট্রি আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৮,৫০০ পশু জলের তোড়ে ভেসে গেছে। গুয়াহাটির মতো শহুরে অঞ্চলেও জীবনযাত্রা স্বাভাবিক নয়। সতগাঁও ও হাতিগাঁওয়ের মতো এলাকায় এসডিআরএফ এবং জেলা বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী নৌকার সাহায্যে মানুষকে উদ্ধার করেছে।

এই সংকট মোকাবিলায় প্রশাসন ১০৫টি ত্রাণশিবির ও বিতরণ কেন্দ্র চালু করেছে, যেখানে ৪৪ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেপি নড্ডা ইতিমধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করে ত্রাণের কাজ পর্যালোচনা করেছেন। এর পাশাপাশি, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজে এগিয়ে এসেছেন সমাজসেবী ও তারকারাও। অভিনেতা সলমন খানের সংস্থা ‘বিইং হিউম্যান’ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাম নেপালি খুটিতে ২২০টি আংশিক স্থায়ী বন্যা-প্রতিরোধী ঘর তৈরি করে দিয়েছে। অভিনেতা রণদীপ হুড্ডা ও ‘গ্লোবাল সিক্সস’-এর যৌথ উদ্যোগে মোট ৫০০টি ঘর তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তবে এই উদ্ধারকাজের মাঝেই নাগালাগ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অবাধ র্যাট-হোল কয়লা ও পাথর উত্তোলন নিয়ে চরম রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্থানীয় মানুষ ও বিরোধীদের অভিযোগ, এই অবৈধ খননের ফলেই ডিখৌ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হয়েছে এবং বন্যা এত ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে জানিয়েছেন যে, পাহাড়ি অঞ্চলের অতিরিক্ত জলের জন্যই এই বিপর্যয় ঘটেছে।