ক্যাফে-বারে বই পড়া নিয়ে সেলফি তোলার হিড়িক! নতুন শুরু হওয়া ‘সোশ্যাল রিডিং’ ট্রেন্ড কী জানেন?

শহর সবেমাত্র একটু একটু করে ঢুলতে শুরু করেছে। অফিসের একরাশ ক্লান্তি দূর করে বাস-ট্রেনের ভিড় ঠেলে মানুষ যখন গৃহাভিমুখী, তখন শহরের ক্যাফে, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও বারগুলো সেজে উঠছে লাল-হলুদ-নিয়ন আলোয়। সাধারণত এই জায়গাগুলিতে আড্ডা ও হইচইয়ের ছবিই চেনা, কিন্তু বর্তমান সময়ে ক্যাফেগুলির দরজা খুললে চোখে পড়বে সম্পূর্ণ এক অন্য দৃশ্য। ক্যাফেতে বসে অসংখ্য মানুষ, অথচ কোথাও কোনো কোলাহল নেই। কারও হাতে উপন্যাস, কারও হাতে কবিতার বই, কেউ আবার মগ্ন প্রবন্ধের পাতায়। টানা দু’-আড়াই ঘণ্টা নিরবে পড়ার পর্ব শেষ হওয়ার পর শুরু হয় আসল আকর্ষণ—বই নিয়ে খোলামেলা আলোচনা। কে কী পড়ছেন, কোন বইটি ভালো লাগল বা পরবর্তী সময়ে কী পড়া উচিত, সেই নিয়ে চেনা-অচেনা মানুষের আড্ডায় মেতে ওঠেন সকলে। অস্ট্রেলিয়া সহ বিশ্বের নানা প্রান্তে এখন এভাবেই অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘সোশ্যাল রিডিং’ (Social Reading) বা ক্যাফে-বারে একসঙ্গে বই পড়ার অভিনব সংস্কৃতি।

কীভাবে শুরু হল এই ট্রেন্ড?

বই পড়াকে নিছক একাকী অভ্যাসের গণ্ডি থেকে বের করে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি ‘সামাজিক’ অভ্যাসে বদলে দেওয়ার এই ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের বাসিন্দা গ্র্যান্ট ক্রুপ। প্রায় ১৫ বছর আগে একটি পার্টিতে গিয়ে তাঁর মাথায় প্রথম ক্যাফেতে বসে একসঙ্গে বই পড়ার আইডিয়া আসে। পরবর্তীতে ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বারে বসে মানুষের একসঙ্গে বই পড়ার অভিজ্ঞতার কথা পড়ে তাঁর মাথায় আসে ‘Book Doof’-এর ধারণা।

২০২৫ সালের অক্টোবরের মেলবোর্নে প্রথম এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শুরুতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম থাকলেও বর্তমানে একটি Book Doof-এ একসঙ্গে ৩০০ থেকে ৫০০ জন পর্যন্ত মানুষ অংশ নেন।

কী এই ‘Book Doof’? এর নিয়মকানুন

Book Doof-এর নিয়ম অত্যন্ত সহজ। অংশগ্রহণকারীদের নিজের পছন্দমতো একটি বই সঙ্গে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে বসতে হয়। চারপাশ ভরে থাকে হালকা মিউজিকে, কোথাও আবার লাইভ ডিজে-র ব্যবস্থাও থাকে। তবে একটাই কঠোর শর্ত— কথা বলা যাবে না। সবাই নিজের মতো করে বইয়ে ডুবে থাকেন। উদ্যোক্তা গ্র্যান্টের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে, ভবিষ্যতে শুধু বই পড়াই নয়, মানুষ চাইলে সেখানে ডায়েরি লেখা, ছবি আঁকা বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজও করতে পারবেন। একসঙ্গে চুপচাপ বসে কাজ করার মধ্যেও যে এক ধরনের মানসিক সংযোগ তৈরি হয়, সেটাই এর মূল উদ্দেশ্য।

নীরবে দীর্ঘ দু’ থেকে আড়াই ঘণ্টা পড়ার পর বদলে যায় পরিবেশ। তখন সবাই এমন একজনের পাশে গিয়ে বসেন, যাঁদের সঙ্গে আগে কোনো পরিচয় ছিল না। শুরু হয় আলাপচারিতা ও বই নিয়ে আলোচনা। অনেকেই এখান থেকে নতুন বন্ধু খুঁজে পেয়েছেন, এমনকি অনেকের প্রেমের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। যদিও গ্র্যান্ট স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, Book Doof-এর উদ্দেশ্য কোনো ডেটিং অ্যাপের মতো ডেটিং করা নয়, বরং একাকিত্ব কাটিয়ে বইয়ের মাধ্যমে সমমনোভাবাপন্ন মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা।

জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘Book Bedazzling’ কর্মশালাও

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ছাড়িয়ে এই ট্রেন্ড এখন সিডনি সহ দেশটির বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সিডনির ‘Romancing the Novel’ নামের একটি বইয়ের দোকানে নিয়মিত আয়োজন করা হয় ‘Book Bedazzling’ কর্মশালার। এখানে পাঠকেরা তাঁদের প্রিয় বইয়ের কভার রঙিন পাথর, মুক্তো, স্টিকার ও নানা আকর্ষণীয় অলংকরণ দিয়ে সাজিয়ে তোলেন। এই কর্মশালার টিকিট বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে যায়।

পাশাপাশি সেখানে রয়েছে ‘Book Bouquet’ নামক আরেকটি জনপ্রিয় আয়োজন, যেখানে একটি বইকে ফুলের তোড়ার মতো সাজিয়ে শিল্পকর্মে রূপ দেওয়া হয়। তবে শর্ত একটাই—একবার বইটি এমনভাবে সাজিয়ে ফেললে তা আর পড়ার কাজে ব্যবহার করা যায় না, সেটি হয়ে ওঠে কেবলই শিল্পের অংশ। দোকানটির মালিক স্কারলেট হপারের লক্ষ্য ছিল এমন একটি নিরাপদ জায়গা তৈরি করা, যেখানে বিশেষ করে মহিলারা নিশ্চিন্তে বই পড়তে পারেন এবং একটি নিজস্ব কমিউনিটি গড়ে তুলতে পারেন।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা ও নতুন সংস্কৃতি

সোশ্যাল মিডিয়াও এই নতুন কালচারকে জনপ্রিয় করে তুলতে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। যেমন— ‘Hot Dudes Reading’ নামের একটি জনপ্রিয় ইনস্টাগ্রাম পেজে জনসমক্ষে বই পড়তে থাকা পুরুষদের ছবি মজার ক্যাপশনসহ পোস্ট করা হয়। কমেন্টে অনেকেই সেই বইগুলোর নাম জানতে চান, যা নতুন বই আবিষ্কারের একটি দারুণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

অস্ট্রেলিয়ার শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা Creative Australia-র সাম্প্রতিক সমীক্ষাও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, নতুন বই সম্পর্কে জানার সবচেয়ে বড় মাধ্যম এখন পরিচিত মানুষের পরামর্শ। অর্থাৎ, বই পড়া আর শুধু ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে আটকে নেই; বরং তা বন্ধুত্ব গড়া এবং একই আগ্রহের মানুষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার এক নতুন সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।