পিএফের নিয়মে বিরাট বদল! পকেটে কি টান পড়বে নাকি এক ধাক্কায় বাড়বে অবসরকালীন সঞ্চয়?

কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ মন্ত্রক প্রভিডেন্ট ফান্ড বা পিএফ (PF) সংক্রান্ত নিয়মে এক বড়সড় ও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে চলেছে, যা সরাসরি দেশের লক্ষ লক্ষ চাকুরিজীবী মানুষের মাসিক বেতন এবং বার্ধক্যকালীন পেনশনের হিসাব পুরোপুরি পাল্টে দেবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকার পিএফ কাটার বাধ্যতামূলক বেতন সীমা বা মজুরি লিমিট এক লাফে ১৫,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫,০০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে একদিকে যেমন কর্মচারীদের হাতে আসা নগদ বেতনের পরিমাণ কিছুটা কমে যাবে, অন্যদিকে তাঁদের ভবিষ্যৎ সঞ্চয় এবং মাসিক পেনশনের অঙ্ক সুরক্ষিত হবে। সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে দেশের বিশাল সংখ্যক মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী সরাসরি এর আওতায় চলে আসবেন, যা আগামী দিনে তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
পুরনো নিয়ম অনুযায়ী, এতদিন পর্যন্ত যদি কোনো কর্মীর মূল বেতন এবং মহার্ঘ ভাতা মিলিয়ে প্রতি মাসে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতো, তবেই তাঁর পিএফ কর্তন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু যাঁদের মূল বেতন এর থেকে বেশি ছিল, তাঁরা চাইলে পিএফ কাটানোর বিকল্প বেছে নিতে পারতেন অথবা তা এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান সংশোধন অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট সীমা বাড়িয়ে সরাসরি ২৫,০০০ টাকা করা হয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো, এখন থেকে যাঁদের মূল বেতন মাসিক ১৫,০০১ টাকা থেকে ২৫,০০০ টাকার মধ্যে রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেকের বেতন থেকেই বাধ্যতামূলকভাবে পিএফ-এর টাকা কেটে নেওয়া হবে। পাশাপাশি, এই পরিবর্তনের ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা ইপিএস (EPS) বা পেনশন স্কিমের সুবিধার জন্যও সরাসরি যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। প্রায় এক দশক পর অর্থাৎ শেষবার ২০১৪ সালে এই সীমা ৬,৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫,০০০ টাকা করার দীর্ঘ সময় বাদে এই পরিবর্তন আনা হলো।
এই নতুন নিয়মের ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে যে, মাসের শেষে কর্মচারীদের হাতে আসা টেক-হোম সেলারির কী হবে? হিসাব বলছে, যেহেতু এখন থেকে পিএফ অ্যাকাউন্টে আগের তুলনায় বেশি টাকা জমা হবে, তাই প্রতি মাসের নির্দিষ্ট দিনে হাতে পাওয়া বেতনের পরিমাণ সাময়িকভাবে কিছুটা কমে যাবে। তবে আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আদতে কোনো আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং একটি অত্যন্ত লাভজনক এবং সুদূরপ্রসারী দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো কর্মীর মূল বেতন ২২,০০০ টাকা হয়, তবে পুরনো নিয়মে তাঁর পিএফ কাটা বাধ্যতামূলক না থাকায় তিনি পুরো টাকাই হাতে পেতেন। কিন্তু নতুন নিয়ম চালু হওয়ার পর তাঁর মূল বেতনের ১২ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি মাসে ২,৬৪০ টাকা পিএফ হিসেবে কাটা হবে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট সংস্থাও সমপরিমাণ অর্থ কর্মীর অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়ায় প্রতি মাসে মোট ৫,২৮০ টাকা সঞ্চয় হবে। একইভাবে, যাঁদের বেতন ২৫,০০০ টাকা, তাঁদের ক্ষেত্রেও পিএফ কাটার পরিমাণ ১,৮০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩,০০০ টাকায় উন্নীত হবে।
এই পরিবর্তনের ফলে একদিকে যেমন কর্মচারীদের ভবিষ্যতের সঞ্চয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, তেমনই অন্যদিকে নিয়োগকারী কোম্পানি এবং সরকারের আর্থিক দায়বদ্ধতাও অনেকটাই বেড়ে যাবে। নিয়ম অনুযায়ী, কর্মচারীর মূল বেতনের ১২ শতাংশ কাটার পাশাপাশি কোম্পানিগুলিকেও সমপরিমাণ অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে জমা করতে হয়। ফলে নতুন নিয়মে আরও বেশি সংখ্যক কর্মীর আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে কোম্পানিগুলির মাসিক পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সরকারের পেনশন তহবিলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। তবে সার্বিক দিক বিচার করলে মুদ্রাস্ফীতি এবং বর্তমান বাজারদরকে মাথায় রেখে সরকারের এই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ দেশের অসংগঠিত ও মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবী সমাজের ভবিষ্যৎকে আরও বেশি শক্তিশালী এবং অর্থনৈতিকভাবে সুরক্ষিত করে তুলবে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।