বাঁকুড়ার ‘ভূতের গ্রাম’! মহামারীর কোপে জনশূন্য চালেবাড়িরডিহিতে আজও বুক চিতিয়ে লড়ছে কোন অদম্য পরিবার?

বাঁকুড়া জেলার গঙ্গাজলঘাটি ব্লকের অন্তর্গত চালেবাড়িরডিহি গ্রামটি আজও রাজ্যজুড়ে ‘ভূতের গ্রাম’ নামেই পরিচিত। স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ফেরে এই জনপদকে ঘিরে থাকা নানা রহস্যময় ও লোমহর্ষক কাহিনি। জনশ্রুতি রয়েছে যে, একসময়ে এই গ্রামে বহু মানুষের কোলাহলপূর্ণ বসবাস ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ এক মহামারীর কোপে এই আস্ত গ্রামটি প্রায় পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়ে। সেই থেকে স্থানীয় মানুষের মনে অশরীরী আত্মা ও ভূতের উপস্থিতির নানা কল্পিত গল্প ডালপালা মেলতে শুরু করে। বর্তমানে এই পুরোটাই জনমানবহীন ও রহস্যঘেরা পরিবেশ, যেখানে সন্ধ্যা নামলেই নেমে আসে গা ছমছমে নিস্তব্ধতা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মণ বাউড়ির বাবা দক্ষিণ বাউড়ির চাষবাসের মূল জমিগুলি এই গ্রামেই ছিল। তাই দীর্ঘদিন গ্রাম ছেড়ে অন্য জায়গায় থাকার পরও পরিবারটি শেকড়ের টানে আবার ফিরে আসে। ১৯৮২ সালে লক্ষ্মণ বাউড়ি এই পরিত্যক্ত গ্রামে নতুন করে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে তাঁর দেখাদেখি আরও ১৫টি পরিবার এখানে এসে বসবাস শুরু করলেও, প্রায় এক দশক আগের একটি মর্মান্তিক শিশুহত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের ভূতের গুজব ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তীব্র ভয়ে একে একে সব পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেলেও, স্ত্রী রিনা বাউড়ি এবং তিন সন্তানকে নিয়ে এই প্রতিকূলতায় একা লড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন লক্ষ্মণ। তাঁর নিজের ভাষায়, “সন্ধ্যা নামলেই চারপাশে নানা ধরনের অদ্ভুত শব্দ কানে আসে, কিন্তু পূর্বপুরুষের এই ভিটেমাটি ছেড়ে কোথাও চলে যেতে মন চায় না।”

এই পাঁচজনের ছোট্ট সংসারে বড় ছেলে সুরজ বাউড়ি বর্তমানে মহারাষ্ট্রের একটি বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত থেকে পরিবারের আর্থিক হাল ধরেছেন। অন্যদিকে, লক্ষ্মণ বাউড়ি নিজে কঠোর পরিশ্রম করে চাষবাসের মাধ্যমেই সংসার চালান। তাঁর দ্বিতীয় ছেলে শুভদীপ বাউড়ি গঙ্গাজলঘাটি হাই স্কুলের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র এবং মেয়ে বৃষ্টি বাউড়ি গোবিন্দ প্রসাদ মহাবিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিন ভাইবোনেরই প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এই গ্রামেরই একটি স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। সুরজ বাউড়ির দাবি অনুযায়ী, “গ্রামের এই স্কুলটিতে আজও নিয়মিত পঠন-পাঠন হয় এবং শিক্ষক মহাশয়রাও আসেন।” তবে তিন ভাইবোনের একটাই বড় আক্ষেপ ও উৎকণ্ঠা রয়েছে, তা হলো গ্রামে হঠাৎ কোনো মারাত্মক বিপদ বা জরুরি স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হলে সাহায্য করার মতো আশেপাশে কাউকে পাওয়া যায় না। পাশাপাশি পরিবারের বধূ রিনা বাউরী জানিয়েছেন, “সরকার থেকে আমরা নিয়মিত রেশন পাচ্ছি এবং বিদ্যুতের সংযোগ থাকায় ঘরে আলো রয়েছে। ভোটদানের জন্য আমাদের বরজুরি গ্রামে যেতে হয়।”

যদিও বিজ্ঞাপনী বা লোককথার এই ভূতুড়ে দাবির সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন যুক্তিববাদীরা। তাঁদের জোরালো দাবি, চালেবাড়িরডিহিতে অলৌকিক বা ভূতের বিন্দুমাত্র কোনো অস্তিত্ব নেই। বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা অন্ধবিশ্বাস এবং লোকমুখে প্রচলিত কাল্পনিক গল্পই এই গ্রামের রহস্যময় পরিচয়ের প্রধান কারণ। বাস্তবে এখানে অতীন্দ্রিয় কিছু ঘটে কি না, তার কোনো বৈজ্ঞানিক বা নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় ও নির্মম সত্য হলো—ভয়, চরম নিঃসঙ্গতা আর অনিশ্চয়তার হাজারো বেড়াজালকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পূর্বপুরুষের ভিটে আঁকড়ে আজও সাহসিকতার সঙ্গে টিকে রয়েছে একটিমাত্র সংগ্রামী পরিবার। আর সেই অনন্য লড়াইয়ের জন্যই চালেবাড়িরডিহি আজও মানুষের কাছে ‘ভূতের গ্রাম’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে রয়েছে।