উত্তরপ্রদেশে ‘এমওয়াই’ সমীকরণ ভেঙে নতুন চাল অখিলেশের! ২০২৭-এর লড়াইয়ে পদ্মশিবিরে ত্রাস বাড়াতে মোক্ষম অস্ত্র এসপির

আসন্ন ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক রণকৌশলে এক বিরাট ও ঐতিহাসিক বদল আনতে চলেছে অখিলেশ যাদবের নেতৃত্বাধীন সমাজবাদী পার্টি (SP)। এতদিন ধরে দলের ঐতিহ্যবাহী ও চেনা সমীকরণ হিসেবে শুধুমাত্র ‘এমওয়াই’ (মুসলিম-যাদব) কিংবা ‘পিডিএ’ (পিছিয়ে পড়া, দলিত, সংখ্যালঘু) কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, এবার উচ্চবর্ণ এবং বিশেষ করে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্রাহ্মণ ভোটব্যাঙ্কে নিজেদের রাজনৈতিক মুঠো শক্ত করতে চলেছে সপা। এই লক্ষ্যেই মঙ্গলবার রাজ্যের রাজধানী লখনউতে একটি বিশাল ‘প্রবুদ্ধ সম্মেলন’ বা বুদ্ধিজীবী সম্মেলনের আয়োজন করেছে সমাজবাদী পার্টি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চেনা গণ্ডি পেরিয়ে দলের ভোটব্যাঙ্কের পরিধি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার এটি এক সুচিন্তিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল।
জানা গিয়েছে, রাজধানী লখনউতে আয়োজিত আজকের এই মেগা সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন সমাজবাদী পার্টির জাতীয় সভাপতি তথা রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব (Akhilesh Yadav)। দলের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানে দলের প্রবীণ নেতা, প্রাক্তন সাংসদ, বিধায়ক, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট প্রতিনিধি এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধু-সন্ত সহ প্রায় ২০ হাজার মানুষের এক বিশাল সমাগমের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। প্রথমে এই গুরুত্বপূর্ণ সভাটি শহরের প্রখ্যাত জনেশ্বর মিশ্র পার্কে আয়োজিত হওয়ার কথা নির্ধারিত থাকলেও শেষ মুহূর্তে প্রশাসনিক অনুমতি না মেলায় তা দলের রাজ্য সদর দফতরে স্থানান্তরিত করা হয়। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রয়াত সমাজবাদী নেতা, দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং একসময়ের অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘ব্রাহ্মণ মুখ’ হিসেবে পরিচিত জনেশ্বর মিশ্রের জন্মবার্ষিকীর দিনেই এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এর পেছনে দলের পক্ষ থেকে এক জোরালো আদর্শগত ও ঐতিহাসিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কেন এই কৌশলগত বদল আনতে বাধ্য হলো সপা?
উত্তরপ্রদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে সমাজবাদী পার্টি মূলত ‘এমওয়াই’ এবং পরবর্তী সময়ে ‘পিডিএ’ ফর্মুলার ওপর ভর করেই তাদের রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে এসেছে। কিন্তু রাজ্যের মসনদে পুনরায় ফিরে আসতে গেলে যে উচ্চবর্ণের ভোটারদের বিশেষ করে ব্রাহ্মণ সমাজের শক্তিশালী সমর্থন অপরিহার্য, তা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছে সপা নেতৃত্ব। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে উচ্চবর্ণের ভোট বরাবরই ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) প্রধান শক্তির অন্যতম মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ঠিক সেই বিজেপির দুর্ভেদ্য দুর্গেই ফাটল ধরাতে এবার কোমর বেঁধে আসরে নেমেছে অখিলেশ শিবির। তবে দলের দীর্ঘদিনের মূল ভিত্তি ‘পিডিএ’ ফর্মুলাকে কোনোভাবেই দুর্বল না করে এই নতুন সামাজিক সমীকরণ ও ভারসাম্যের রক্ষা করাটাই বর্তমানে অখিলেশ যাদবের সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
দলের ভেতরে ব্রাহ্মণ মুখ এবং বর্তমান রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
এই পুরো বিশাল কর্মসূচিটি সুচারুভাবে সাজানোর নেপথ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বালিয়ার সাংসদ সনাতন পাণ্ডে। তিনি বর্তমানে লোকসভায় সমাজবাদী পার্টির একমাত্র ব্রাহ্মণ সাংসদ। ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট নেতা, প্রাক্তন বিধায়ক এবং হেভিওয়েট ধর্মীয় গুরুদের এই সম্মেলনে সসম্মানে আমন্ত্রণ জানাতে তিনি গোটা রাজ্যজুড়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। পাশাপাশি, দলে ব্রাহ্মণ নেতৃত্বের গুরুত্ব ও গ্রহণযোগ্যতা জোরালোভাবে তুলে ধরতে বিরোধী দলনেতা তথা সাতবারের বর্ষীয়ান বিধায়ক মাতা প্রসাদ পাণ্ডে এবং প্রাক্তন মন্ত্রী অধ্যাপক অভিষেক মিশ্রের মতো অভিজ্ঞ মুখগুলোকে সামনে আনছে দল। যদিও রাজনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে, সমাজবাদী পার্টিতে ব্রাহ্মণ প্রতিনিধিত্ব এখনও তুলনামূলকভাবে বেশ কম—দলের ৩৭ জন লোকসভার সাংসদের মধ্যে মাত্র একজনই এই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বিধানসভাতেও উপস্থিতি সামান্য। তবুও আসন্ন ২০২৭ সালের মহারণে বিজয় কেতন ওড়াতে এই ‘প্রবুদ্ধ সম্মেলন’-এর হাত ধরে নতুন সমীকরণের সপক্ষে জোরালো সওয়াল করছে অখিলেশ যাদবের দল।