ঝালদা কাণ্ডে বড় মোড়! কংগ্রেস কাউন্সিলর তপন কান্দু খুনে ধৃত ‘সুপারি কিলার’ কলেবর সিংয়ের মৃত্যু

ঝালদা পুরসভার কংগ্রেস কাউন্সিলর তপন কান্দু হত্যা মামলায় এক বড় এবং নাটকীয় মোড় সামনে এসেছে। রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে দেওয়া এই বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনায় জড়িত এক মূল অভিযুক্ত তথা অভিযুক্ত সুপারি কিলার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে মারাত্মক অসুস্থতাজনিত শারীরিক জটিলতায় ভুগে সোমবার সকালে পুরুলিয়া গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে ৫৮ বছর বয়সী কলেবর সিংয়ের।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মৃতদেহের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আজ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সরাসরি উপস্থিতিতে সুরতহাল বা ইনকোয়েস্ট রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এরপর আগামী কাল অর্থাৎ বুধবার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দল দ্বারা মৃতদেহের ময়নাতদন্ত বা পোস্টমর্টেম সম্পন্ন হবে। সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের নিকটজনদের হাতে মৃতদেহ তুলে দেওয়া হবে বলে পুলিশ প্রশাসন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে।

গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই বিচারাধীন বন্দি হিসেবে কলেবর সিংয়ের ঠিকানা হয়েছিল পুরুলিয়া জেলা সংশোধনাগারে। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি গুরুতর শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত প্রায় চার মাস ধরে তাঁকে পুরুলিয়া গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রিজন সেলে ভর্তি রেখে চিকিৎসা চালানো হচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে সোমবার সকালেই তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী প্রতিমা দেবী সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে জানান যে, তাঁর স্বামী দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে এর আগেও তাঁকে চিকিৎসার জন্য একাধিক ভিন্ন হাসপাতালেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরিবার এবং আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বারবার জামিনের জোরালো আবেদন জানানো হলেও আদালত তা মঞ্জুর করেনি। স্বামীর অপরাধের বিষয়ে স্ত্রীর বক্তব্য, তিনি আদতে স্বামী খুন করেছিলেন কি না সে বিষয়ে তাঁর কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই, তবে এই মুহূর্তে কারও প্রতি তাঁর কোনো রকম ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই।

উল্লেখ্য, ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে চার বছর আগে ২০২২ সালের ১৩ মার্চ তারিখে। ওই দিন সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে প্রাতঃভ্রমণ বা সাধারণ পাহারায় বেরিয়ে ঝালদা শহরের ২ নম্বর ওয়ার্ডের জনপ্রিয় কংগ্রেস কাউন্সিলর তপন কান্দু দুষ্কৃতীদের অতর্কিত গুলিতে নির্মমভাবে খুন হন। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জেরে গোটা রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রথমে রাজ্য সরকারের গঠিত স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম বা সিট এবং পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টের কঠোর নির্দেশে এই চাঞ্চল্যকর মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। সিটের তদন্ত চলাকালীনই ঝাড়খণ্ডের বোকারো জেলার জারিডি থানা এলাকার গাইছাদ গ্রামের বাসিন্দা এই কলেবর সিংকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল।

তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২২ সালের জুন মাসেই সিবিআই নির্দিষ্ট আদালতে এই মামলার মূল চার্জশিট জমা দেয়। সেই চার্জশিটে মোট পাঁচজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়েছিল—দীপক কান্দু, কলেবর সিং, নরেন কান্দু, মহম্মদ আশিক এবং সত্যবান প্রামাণিক। তবে অত্যন্ত বিচক্ষণ বিষয় হলো, এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলমান অবস্থাতেই অসুস্থতার কারণে একে একে দু’জন অভিযুক্তের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটল। কলেবর সিংয়ের ঠিক আগে ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর অসুস্থতাজনিত কারণেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন অপর অভিযুক্ত সত্যবান প্রামাণিক। অন্যদিকে, এই মামলার অপর অভিযুক্ত নরেন কান্দু ও দীপক কান্দু বর্তমানে কলকাতা হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। একের পর এক অভিযুক্তের মৃত্যু এই হাই-প্রোফাইল মামলার গতিপ্রকৃতিকে কোন দিকে মোড় দেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।