ডায়মন্ড হারবারের সেই ‘মেগা কোভিড টেস্ট’ ড্রাইভ নিয়ে বড় পদক্ষেপ, তদন্তের নির্দেশ এনএমসি-র

২০২২ সালের বহুচর্চিত ডায়মন্ড হারবার মেগা কোভিড-১৯ টেস্টিং ড্রাইভ নিয়ে ওঠা চিকিৎসাগত অসদাচরণ ও তথ্যে অসঙ্গতির অভিযোগে অবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় পদক্ষেপ করল জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন (NMC)। বিভিন্ন মহলের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এনএমসি-র এথিক্স অ্যান্ড মেডিক্যাল রেজিস্ট্রেশন বোর্ড (EMRB) পুরো বিষয়টি তদন্তের জন্য সরাসরি পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের কাছে পাঠিয়েছে এবং নির্দিষ্ট বিধি মেনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে। এই নির্দেশ ঘিরে রাজ্য রাজনীতি ও চিকিৎসা মহলে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত অভিজিৎ দাস (ববি) নামক এক ব্যক্তির করা অভিযোগের ভিত্তিতে। তিনি পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিল এবং জাতীয় মেডিক্যাল কমিশন সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। তাঁর মূল দাবি, ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের অধীনে মাত্র একদিনে ২৬০টি কেন্দ্র, ২৩টি মোবাইল ইউনিট এবং ৩০টি কিয়স্কের মাধ্যমে ৫৩ হাজার ২০৩টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হয়েছিল বলে দাবি করা হলেও, সেই বিশাল তথ্য এবং প্রক্রিয়ার মধ্যে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এত বিপুল পরিমাণ নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং তার সঠিক তথ্য যাচাইয়ের মতো জটিল কাজের জন্য মাত্র ২৬ জন চিকিৎসককে তদারকির দায়িত্বে রাখা হয়েছিল, যা বাস্তবসম্মত নয়।

পাশাপাশি অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেদিনের রাজ্য সরকারের প্রকাশিত স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী ওই একই দিনে সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে মোট পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ৭১ হাজার ৭৯২টি। এই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে অভিযোগ করা হয়েছে যে, যদি এককভাবে শুধুমাত্র ডায়মন্ড হারবারেই ৫৩ হাজার ২০৩টি পরীক্ষা হয়ে থাকে, তবে বাকি পুরো রাজ্যে পরীক্ষার সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে কমে যায়। এছাড়া আইসিএমআর (ICMR)-এর নির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে কোল্ড চেইন রক্ষা করা, কিটের ব্যাচ ভ্যালিডেশন সুনিশ্চিত করা, বায়োমেডিক্যাল বর্জ্য নিষ্পত্তির উপযুক্ত নথি সংরক্ষণ এবং সঠিক অডিট ট্রেলের অভাব রয়েছে বলেও অভিযোগে জোরালো দাবি করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সরকারি প্রচারমূলক কার্যক্রমে রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহারের মতো বিষয়ও এই অভিযোগে স্থান পেয়েছে, যা চিকিৎসা পেশার নিরপেক্ষতার পরিপন্থী বলে অভিযোগকারীর মত।

এই অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও ডায়মন্ড হারবার স্বাস্থ্য জেলার চিফ মেডিক্যাল অফিসার অব হেলথ (CMOH), বিষ্ণুপুর-১ ও বিষ্ণুপুর-২ ব্লকের তৎকালীন ব্লক মেডিক্যাল অফিসার অব হেলথ (BMOH) এবং ডেটা ভ্যালিডেশন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানানো হয়েছিল। এনএমসি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেই চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল (প্রফেশনাল কন্ডাক্ট, এটিকেট অ্যান্ড এথিক্স) রেগুলেশন, ২০০২-এর ৮.২ ধারা অনুযায়ী চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওঠা পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূর্ণ একচ্ছত্র ক্ষমতা রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের হাতেই ন্যস্ত রয়েছে।

সেই কারণেই এই অভিযোগগুলি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে, সমগ্র বিষয়টি অভিযোগকারীকে অবহিত করতে এবং এই বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপের একটি বিস্তারিত রিপোর্ট অবিলম্বে এনএমসি-কে পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সচেতন মহলের মতে, এই অভিযোগগুলির সত্যতা এখনও পর্যন্ত আইনিভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং পুরো বিষয়টি বর্তমানে সম্পূর্ণভাবে তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ মেডিক্যাল কাউন্সিলের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই কেবল এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগগুলির আসল সত্যতা এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হবে।