সব্যসাচী দত্তের ঘনিষ্ঠদের ঠিকানায় সকাল থেকে তল্লাশি, আর্থিক তছরুপের খোঁজে কেন্দ্রীয় এজেন্সি

রাজারহাটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং একাধিক ব্যাঙ্ক লকার থেকে বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে এল এক বিরাট ও নতুন মোড়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের পর এবার শুক্রবার আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ময়দানে নামল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এদিন সকাল থেকেই কলকাতা ও সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। খিদিরপুর, রাজারহাট এবং নিউ টাউন-সহ মোট ১২টি নির্দিষ্ট ঠিকানায় হানা দিয়ে নথিপত্র খতিয়ে দেখছেন ইডির আধিকারিকেরা।
এই গোটা তদন্তের একেবারে কেন্দ্রে রয়েছেন রাজ্যের প্রভাবশালী রাজনীতিক, প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা বিধাননগর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ব্যক্তিরা। ইডি সূত্রে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, এদিনের এই সাঁড়াশি অভিযান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং পুলিশের তদন্তে উঠে আসা সুনির্দিষ্ট তথ্য, নথি এবং প্রাথমিক জোরালো প্রমাণের ভিত্তিতে অর্থপাচার বা মানি লন্ডারিংয়ের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতেই এই অভিযান। প্রসঙ্গত, গত বেশ কিছুদিন ধরেই আইনি হেফাজতে জেলের অন্দরে দিন কাটাচ্ছেন সব্যসাচী দত্ত।
তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য এখন— উদ্ধার হওয়া প্রায় সাড়ে তিন কেজি সোনার প্রকৃত উৎস কী, এই বিপুল পরিমাণ সোনা কেনার জন্য এত টাকা কোথায় পেলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, এর সপক্ষে কোনো বৈধ নথি রয়েছে কি না এবং গোটা এই আর্থিক লেনদেনের পেছনে কোনো সুসংগঠিত চক্র কাজ করছে কি না, তার উত্তর খুঁজে বের করা। শুক্রবার ভোররাতেই একাধিক বিশেষ দলে ভাগ হয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সশস্ত্র জওয়ানদের সঙ্গে নিয়ে নির্দিষ্ট ঠিকানাগুলিতে পৌঁছে যান ইডির গোয়েন্দারা।
একাধিক অভিজাত আবাসন, ব্যবসায়িক অফিস এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ঠিকানায় এই একযোগে তল্লাশি চালানো হয়। ইডি সূত্রে জানা গিয়েছে, কাগজের ফাইলের পাশাপাশি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বিবরণী, সম্পত্তি সংক্রান্ত দলিল, আর্থিক লেনদেনের হিসাব, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার এবং হার্ড ডিস্কের মতো বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আধুনিক ডিজিটাল তথ্য ও ফিনান্সিয়াল ট্রেইল বিশ্লেষণের মাধ্যমে টাকার সঠিক গতিপথ এবং সম্ভাব্য গোপন আর্থিক নেটওয়ার্ক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন তদন্তকারীরা।
উল্লেখ্য, এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল কদিন আগে পুলিশের একটি আকস্মিক অভিযান থেকে। তদন্তকারীরা সব্যসাচী দত্তকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর রাজারহাটের ফ্ল্যাটে ম্যারাথন তল্লাশি চালান এবং পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্ক লকারও খুলে দেখেন। সেখান থেকেই মোট প্রায় সাড়ে তিন কেজি সোনা উদ্ধার হয়। এত বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধারের পরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল যে, এই সমস্ত সম্পদ কি সম্পূর্ণভাবে বৈধ উপায়ে কেনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অন্য কোনো আর্থিক অপরাধ বা বেআইনি অর্থপাচারের যোগ?
অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন (PMLA)-র কঠোর ধারার আওতায় কোনো ‘প্রসিডস অফ ক্রাইম’ বা অপরাধলব্ধ অর্থের ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেই দিকটি এখন অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইডি সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে যে, এদিনের তল্লাশিতে যে সমস্ত নথি ও ডিজিটাল তথ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, সেগুলির ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হবে। প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের কাছ থেকেও তথ্য তলব করা হতে পারে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংস্থার ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হবে বলে খবর।
স্বাভাবিকভাবেই, এই মেগা অভিযানের প্রবল রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে, কারণ তদন্তের সরাসরি কেন্দ্রে রয়েছেন রাজ্যের এক পরিচিত হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ফলে শুক্রবার সকাল থেকেই ইডির এই ম্যারাথন তল্লাশি ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে চরম শোরগোল ও জোর চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে সব্যসাচী দত্তের আইনি প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ইডি আধিকারিকরাও এই মুহূর্তে তদন্তের স্বার্থে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলতে নারাজ। তবে তদন্তকারী মহলের স্পষ্ট বক্তব্য, সোনা উদ্ধারের এই ঘটনার রহস্য ভেদ করতে এবং সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পেতে এই মেগা তল্লাশির অগ্রগতিই এখন মূল চাবিকাঠি। আগামী দিনে উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল প্রমাণ ও নথিপত্র বিশ্লেষণের পর এই বহুচর্চিত আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলায় আরও একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসতে পারে বলেই মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।