দুয়ারে বন্যা, উঠোনে ডিঙি! বর্ষার আগে জীবন বাঁচাতে ১৩-১৫ হাজার টাকায় নৌকা কিনছেন ঘাটালবাসী

অন্যান্য জায়গায় বর্ষার আগে মানুষ ছাতা, বর্ষাতি বা রেনকোট কেনেন; কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের ঘাটালে বর্ষার প্রস্তুতির তালিকায় সবার আগে থাকে একটি ছোট্ট ডিঙি নৌকা। আকাশে কালো মেঘ জমলেই এখানে প্রতিটি বাড়ির উঠোনে নামিয়ে রাখা হয় ছোট্ট এই জলযানটি। কারণ ঘাটালের মানুষ হাড়ে হাড়ে জানেন, মুষলধারে বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গেই যেকোনো মুহূর্তে রাস্তাঘাট জলের তলায় তলিয়ে যেতে পারে। তখন বাইক, সাইকেল, এমনকি চারচাকা গাড়িও সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে! সেই চরম বিপদের দিনে একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ওই ডিঙি।

বর্তমানে ঘাটালের স্থানীয় বাজারে এই ডিঙির চাহিদা আকাশচুম্বী। তালকাঠ কিংবা আধুনিক শিট দিয়ে তৈরি এই ছোট নৌকাগুলি বর্তমানে ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম কিছুটা বাড়লেও ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় একটুও কমেনি। কারণ এই জলযান এখানকার মানুষের কাছে কোনো শখের বস্তু নয়, বরং প্রতি বছরের বন্যা মোকাবিলায় প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র অবলম্বন।

পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল বরাবরই দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রধান বন্যাপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। শিলাবতী, কংসাবতী এবং রূপনারায়ণ নদীর জলস্তর সামান্য বাড়লেই এলাকার মানুষের মনে বিপদের ঘণ্টা বেজে ওঠে। তার ওপর যদি টানা বর্ষণ চলে কিংবা জলাধারগুলি থেকে অতিরিক্ত জল ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে মুহূর্তের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। ডুবে যায় রাস্তাঘাট, সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গ্রামগুলির যোগাযোগ ব্যবস্থা। তখন বাজার করা, স্কুলে যাওয়া, বা কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া—সবকিছুর সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হয়ে ওঠে ছোট্ট এই ডিঙি নৌকাটি।

এই কারণেই বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই ঘাটালের বিভিন্ন গ্রামে নৌকা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততা চরমে পৌঁছায়। কোথাও শোনা যায় করাতের তীব্র শব্দ, কোথাও আবার হাতুড়ির ঠকঠকানি। কারিগরদের নিপুণ হাতে একের পর এক ডিঙি তৈরি হতে থাকে। তালকাঠের পাশাপাশি বর্তমানে শিট দিয়ে তৈরি হালকা ডিঙির চাহিদাও দারুণভাবে বেড়েছে। কম ওজন, সহজে বহনযোগ্য এবং তুলনামূলক কম রক্ষণাবেক্ষণের কারণেই আজকাল অনেকে এই ধরনের নৌকার দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মায়া মাইতি জানান, “বাড়ির সামনে সামান্য জল জমলেই আর হেঁটে যাতায়াত করা যায় না। পানের জল আনা, বাজার করা কিংবা কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া—সবকিছুর জন্যই ডিঙি দরকার। তাই বর্ষার আগে নৌকা না কিনে আমাদের কোনো উপায় থাকে না।” ডিঙি তৈরির কারিগর সুমন মান্না বলেন, “বছরের অন্য সময় সেভাবে বিশেষ কাজ থাকে না। কিন্তু বর্ষা এলেই অর্ডারের চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। ইতিমধ্যে প্রচুর ডিঙি বিক্রি হয়ে গিয়েছে, আর প্রতিদিন নতুন নতুন অর্ডার আসতেই থাকছে। বর্তমানে প্রতিটি ডিঙি ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”

স্থানীয় ব্যবসায়ী সঞ্জীব মাইতি ও সুজিত মাইতির কথায়, “আগে মানুষ একেবারে শেষ মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করতেন। কিন্তু এখন আর কেউ সেই ঝুঁকি নিতে চান না। বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই মানুষ অগ্রিম বুকিং করে রাখছেন। কারণ সবাই জানেন, জল বাড়লে ডিঙিই হবে একমাত্র ভরসা।” প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার সময় বিভিন্ন এলাকায় সরকারি ত্রাণের নৌকা সরবরাহ করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে বাধ্য হয়েই অধিকাংশ পরিবার নিজেদের ব্যক্তিগত নৌকার ওপর নির্ভর করেন। অনেক বাড়ির উঠোনে তাই সাইকেল, মোটরবাইক এবং ডিঙি—এই তিনটি বাহনই পাশাপাশি সাজানো থাকে! শুধু ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বাহন হিসেবে ডিঙিটি সামনে চলে আসে।

উল্লেখ্য, ঘাটালে বন্যার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে বহুচর্চিত ‘ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান’ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক আলোচনা চলে আসছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই মেগা প্রকল্পের কাজ নতুন করে শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে দাবি করা হলেও, কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর এবং তা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে প্রকল্প সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রতি বছর বর্ষা ফিরে আসায় আবারও গভীর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ঘাটালবাসী।

স্থানীয়দের স্পষ্ট বক্তব্য, মাস্টার প্ল্যান সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত না হলে প্রতি বছরই এই একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই সরকারের প্রাশাসনিক প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় বসে না থেকে ঘাটালের মানুষ নিজেদের সুরক্ষায় নিজেরাই আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাড়ির উঠোনে ধুয়ে-মুছে তৈরি রাখা হচ্ছে ডিঙি, নতুন করে শক্ত করে বাঁধা হচ্ছে কাঠের বৈঠা। কারণ তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, জল বাড়লে রাজপথ আর রাস্তা থাকে না, সেটা হয়ে যায় খরস্রো নদী!

ঘাটালে তাই ডিঙি কেবল একটি নৌকা নয়; সেটাই সন্তানের স্কুলে নিরাপদে পৌঁছে যাওয়ার পথ, আকস্মিক অসুস্থ মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার একমাত্র ভরসা, আর বাজার থেকে চাল-ডাল টেনেটুনে বাড়ি আনার বিশ্বস্ত সঙ্গী। ঘাটালের মানুষের কাছে বর্ষা কোনো সাধারণ ঋতু নয়, বরং প্রতি বছরের এক কঠিন জীবন সংগ্রাম ও পরীক্ষা। আর সেই কঠিন পরীক্ষায় ঘাটালের মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও পরীক্ষিত সঙ্গী এখনও সেই ছোট্ট ডিঙিটিই।