চিনির বদলে মধু বা গুড় কি ডায়াবিটিস রোগীদের জন্য নিরাপদ? চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলছে জানুন!

মধুমেহ বা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকেই রোগীদের মনে খাবারের তালিকা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি হয়। চিকিৎসকরা প্রায়শই মিষ্টি জাতীয় খাবার বা কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ পদগুলি থালা থেকে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু বাঙালির প্রতিদিনের চিরচেনা পাতে ভাত কিংবা চিনির স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে গুড় ও মধুর ব্যবহার কতটা যুক্তিযুক্ত? এই পদগুলি কি আদৌ রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, নাকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেই এগুলো খাওয়া সম্ভব? চিকিৎসা বিজ্ঞানের আলোয় এই বিষয়টি জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

যেকোনো খাবারের শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট শরীরে প্রবেশ করার পর তা কতটা দ্রুত রক্তে মিশছে, তা পরিমাপ করার প্রধান উপায় হলো ‘গ্লাইসেমিক ইনডেক্স’ (Glycemic Index বা GI)

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) আসলে কী?

গ্লাইসেমিক ইনডেক্স হলো ০ থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি পরিমাপক স্কেল। কোনো নির্দিষ্ট খাবারে থাকা কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করার পর তা রক্তে শর্করার মাত্রা কতটা দ্রুত বৃদ্ধি করছে, তা এই স্কেলের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। যে খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যত বেশি উচ্চমানের হয়, তা শরীরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই ব্লাড সুগার তত দ্রুত বাড়িয়ে দেয়।

একনজরে দেখে নেওয়া যাক বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় এই তিনটি উপাদানের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বা GI-এর মাত্রা:

  • সাদা ভাত: সাধারণ সাদা ভাতের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স প্রায় ৭০ থেকে ৭৩-এর মধ্যে থাকে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশ উচ্চমাত্রার হিসেবে গণ্য করা হয়।

  • আখের গুড়: খাঁটি আখের গুড়ের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ পর্যন্ত হতে পারে।

  • প্রসেসড মধু: প্রক্রিয়াজাত মধুর গ্লাইসেমিক ইনডেক্সও ৭০-এর উপরে হয়ে থাকে।

অর্থাৎ, এই তিনটি উপাদানই যদি পরিমাণের অতিরিক্ত খাওয়া হয়, তবে তা মুহূর্তের মধ্যে রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

ডায়াবিটিস রোগীরা কি এই খাবারগুলি খেতে পারবেন?

চিকিৎসক মহলের মতে, রক্তে শর্করার মাত্রা যদি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে এই খাবারগুলি কিছু নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে এবং অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা সম্ভব। ডায়াবিটিস ফাউন্ডেশন ইন্ডিয়া-র বিশেষজ্ঞদের মতে, যে সমস্ত রোগীর HbA1c লেভেল পুরোপুরি স্বাভাবিক রয়েছে এবং ডায়াবিটিসজনিত অন্য কোনো গুরুতর শারীরিক জটিলতা (যেমন কিডনি, চোখ বা স্নায়ুর রোগ) নেই, তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অত্যন্ত পরিমিত পরিমাণে এগুলি খেতে পারেন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা রয়েছে যে, সাদা চিনি এড়িয়ে চললেই বোধহয় অপরিমিত গুড় বা মধু খাওয়া নিরাপদ এবং তাতে সুগার বাড়ে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। গুড় বা মধু কখনোই চিনির কোনো ‘নিরাপদ বিকল্প’ হতে পারে না। তাই ব্লাড সুগার নিয়মিত মেপে এবং সপ্তাহে বড়জোর এক বা দু’বারের বেশি এগুলো না খাওয়াই বুদ্ধিমত্তার কাজ।

চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ

১. রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা অনিয়ন্ত্রিত থাকলে সাদা ভাত, গুড় কিংবা মধু—এই প্রতিটি পদই সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে চলা উচিত। ২. ভাতের ক্ষেত্রে শর্করার ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি, ডাল, স্যালাড ও প্রোটিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সুষম আহার (Balanced Diet) গ্রহণ করতে হবে। ৩. চিকিৎসকের বা অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া নিজের খুশিমতো খাদ্যতালিকায় হুট করে কোনো বড় পরিবর্তন না আনাই সবচেয়ে নিরাপদ।