রাজা মরলেই কি বলি দেওয়া হতো সেবকদের? প্রাচীন মিশরের খুলিতেই মিলল লোমহর্ষক তথ্য!

প্রাচীন মিশরের রাজপ্রাসাদ ও ফারাওদের রাজত্ব মানেই রূপকথা আর হাজারো রহস্যের জাল। তবে এবার সেই প্রাচীন ইতিহাসকে কেন্দ্র করে এক অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও রোমহর্ষক তথ্য সামনে এনেছেন গবেষকরা। ক্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগের মিশরের প্রথম রাজবংশের রাজাদের সমাধি ক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া মাথার খুলিগুলো পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, রাজা মারা যাওয়ার পর তাঁর রাজদরবারের কর্মকর্তা, সেবক ও কারিগরদের অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বলি দেওয়া হতো!
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিশরের অ্যাবাইডোসের উম্ম এল-ক্বাব কবরস্থানে রয়েছে প্রথম রাজবংশের রাজাদের রাজকীয় সমাধি। এই কবরস্থানে কেবল ফারাও বা রাজপরিবারের সদস্যরা নন, বরং তাঁদের আশপাশেই সমাহিত করা হয়েছিল রাজপ্রাসাদের নানা সেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত শত শত মানুষকে। এর মধ্যে ছিলেন রাজপরিবারের নারী সদস্য, সীল-মোহর বাহক, পরিদর্শক ও কারিগররা। বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিওলজি’-তে এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।
শতবর্ষের পুরনো বিতর্কে নতুন মোড়
১৯২০-এর দশকে বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক ফ্লিন্ডার্স পেত্রি এই কবরগুলো প্রথম খনন করে ধারণা করেছিলেন যে, এগুলো নরবলির ঘটনা। তবে সে সময় সেবকদের হাড়গোড়ে কোনো আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ায় সেই তত্ত্ব নিয়ে জোরালো বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। কেউ ভেবেছিলেন তাদের জ্যান্ত মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল, আবার কারও মতে তাঁরা স্বাভাবিকভাবেই মারা যাওয়ার পর মরদেহগুলো রাজার সমাধির পাশে এনে দাফন করা হয়েছিল।
এই দীর্ঘ ধোঁয়াশা কাটাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারডু ইউনিভার্সিটি’র গবেষক ড. রোজলিন ক্যাম্পবেল ‘কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি’র সংগ্রহশালা থেকে রাজা আহা, রাজা ডজের, রাজা ডজেট এবং রানি মেরনেইথের সমাধির আশপাশ থেকে উদ্ধার করা ৪৬ জন সেবকের মাথার খুলি নিয়ে নতুন করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান।
খুলিতে প্রাণঘাতী আঘাতের স্পষ্ট ছাপ
গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ওই ৪৬টি খুলির মধ্যে অন্তত ১৮টিতেই সম্ভাব্য প্রাণঘাতী আঘাতের চিহ্ন বা ফাটল রয়েছে। এমনকি একটি খুলিতে চোখের অংশে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর ভয়ঙ্কর দাগও মিলেছে। গবেষকদের মতে, এই আঘাতগুলো প্রাচীন মিশরের শিল্পে দেখা যাওয়া বিজয়ী রাজাদের শত্রুদের ওপর কোপানোর মতো অস্ত্রের নয়, বরং কাঠ বা হরিণের শিং দিয়ে তৈরি চওড়া ও সমতল কোনো ভারী বস্তু দিয়ে সজোরে করা হয়েছিল।
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সালিমা ইকরামের মতে, সেবক বা পরিচারকদের বলি দেওয়ার এই প্রথা খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। পরবর্তীসময়ে মানুষের বদলে মূর্তির ব্যবহার শুরু হয়। তবে সেদিনের সেই বাস্তব দৃশ্যটি যে অত্যন্ত লোমহর্ষক ছিল, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই বিশেষজ্ঞদের। ইতিহাসবিদদের ধারণা, কিছু সেবক হয়তো স্বেচ্ছায় ঈশ্বর-সমতুল্য রাজার সেবায় চিরন্তন জীবন উপভোগ করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাদেরই অনেকেই ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে এই মর্মান্তিক পরিণতি থেকে বাঁচতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।