বিনিয়োগকারীদের পকেট ভরল টাকার মাছি! মাত্র এক মাসে নিফটি আইটি খাতের তাক লাগনো কামব্যাক

বছরের প্রথম ছটি মাস ধরে ভারতীয় শেয়ার বাজারের যে প্রযুক্তি খাতটি বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছিল এবং চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখেছিল, জুলাই মাস আসতেই সেই খাতের রূপ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সমস্ত মন্দার জল্পনা ও আশঙ্কাকারীদের ভুল প্রমাণ করে জুলাই মাসে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাত এক দর্শনীয় ও অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে। যার জেরে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে নিফটি আইটি সূচকের অন্তর্ভুক্ত শেয়ারগুলো বিনিয়োগকারীদের পকেটে প্রায় ৩.৮২ লক্ষ কোটি টাকার বিশাল মুনাফা এনে দিয়েছে। এখন দেশের আর্থিক মহলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, এই দুর্দান্ত তেজিভাব কি আগামী দিনেও দীর্ঘস্থায়ী হবে, নাকি এটি নিছকই একটি সাময়িক বুদবুদ মাত্র?
চলতি বছরের জুলাই মাসে নিফটি আইটি সূচক এক লাফে ১৫.৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সূচকের অন্তর্ভুক্ত ১০টি শক্তিশালী স্টকই বিনিয়োগকারীদের দারুণ লাভ উপহার দিয়েছে, যার মধ্যে অন্তত সাতটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৫ শতাংশের বেশি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি লাভ দিয়েছে পারসিস্টেন্ট সিস্টেমস, যার শেয়ার মূল্য ২৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ঠিক পরেই রয়েছে দেশের অনান্য টেক জায়ান্ট যেমন এইচসিএল টেক এবং এলটিআই মাইন্ডট্রি।
যদি আর্থিক মূল্যের নিরিখে বিচার করা হয়, তবে বাজার মূলধন বৃদ্ধির দিক থেকে টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস বা টিসিএস (TCS) সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। শুধুমাত্র এই একক কোম্পানিটির বাজার মূলধনই প্রায় ১.৪৮ লক্ষ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পরেই শক্তিশালী রিটার্ন দিয়ে তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে এইচসিএল টেক এবং ইনফোসিস। অবাক করার বিষয় হলো, এই প্রধান তিনটি কোম্পানি মিলেই আইটি খাতের মোট ৩.৮২ লক্ষ কোটি টাকা আয়ের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বা সিংহভাগের জন্য দায়ী ছিল।
হঠাৎ কেন ঘটল এই অভাবনীয় উত্থান? এর নেপথ্যে বাজার বিশ্লেষকরা মূল কারণ হিসেবে ‘শর্ট কভারিং’-এর তত্ত্বকে সামনে আনছেন। বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, যে সমস্ত পেশাদার ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীরা বাজার আরও পড়তে পারে এই আশঙ্কায় আগে থেকেই বেয়ারিশ বেট বা শর্ট পজিশন নিয়ে রেখেছিলেন, বাজারের সূচক আচমকা ঘুরে দাঁড়ানোয় তারা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন এবং লোকসান এড়াতে বাধ্য হয়ে চড়া দামে পুনরায় ওই শেয়ারগুলি কিনতে শুরু করেন। ইয়েস সিকিউরিটিজের প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, এই ঝোড়ো বুল রান চলাকালীন আইটি খাতে শর্ট পজিশন বা বেয়ারিশ বেট প্রায় ২২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছিল।
পাশাপাশি, বিশ্ববাজারের মনস্তত্ত্ব এবং বিনিয়োগের ট্রেন্ডেও বড় ধরনের বদল এসেছে। যেসব গ্লোবাল ইনভেস্টররা ইতিপূর্বে বিদেশের বিভিন্ন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) হার্ডওয়্যার কোম্পানিতে বড় অঙ্কের মূলধন ঢালছিলেন, তাঁরা এখন সেখান থেকে ফাণ্ড তুলে নিয়ে অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয় ও সাশ্রয়ী মূল্যায়নে থাকা ভারতীয় আইটি সংস্থাগুলির দিকে ঝুঁকছেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের এই আমূল পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিয়ে স্বনামধন্য ব্রোকারেজ ফার্ম জেফরিজও (Jefferies) ভারতীয় প্রযুক্তি খাতের ওপর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক করে তুলেছে।
তবে সাধারণ ও খুচরা বিনিয়োগকারীদের মনে এখন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এই মুহূর্তে বাজারে টাকা বিনিয়োগ করা কতটা যুক্তিযুক্ত হবে? আর্থিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই অভাবনীয় উত্থানকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী কর্পোরেট আয়ের পরিসংখ্যান এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। রাইট রিসার্চের প্রতিষ্ঠাতা সোনম শ্রীবাস্তব জানাচ্ছেন যে এই উল্লম্ফনের মূল অনুঘটক হলো শর্ট-কভারিং। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় টাকার দুর্বলতা বহুজাতিক আইটি কোম্পানিগুলির বৈদেশিক আয় ও মুনাফা বৃদ্ধিতে দারুণ সহায়ক হতে পারে। তাই তিনি একবারে বড় অংকের বিনিয়োগ না করে, আগামী ছয় মাস ধরে ধাপে ধাপে এবং সুপরিকল্পিতভাবে শক্তিশালী মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনার পরামর্শ দিচ্ছেন।
বেশিরভাগ অভিজ্ঞ বাজার বিশ্লেষকই একমত যে, এই ধরনের আকস্মিক ও তীব্র তেজিভাবের পেছনে অন্ধভাবে ছোটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। অ্যাক্সিস ডিরেক্ট-এর গবেষণা প্রধান রাজেশ পালভিয়া এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, বিনিয়োগকারীদের সবসময় দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের কথা মাথায় রাখা উচিত। যখনই শেয়ার বাজারে সামান্য শ্লথগতি বা কারেকশন দেখা দেবে, তখনই ১২ থেকে ১৮ মাসের দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী ব্যালেন্স শিট এবং পজিটিভ ক্যাশ ফ্লোযুক্ত আইটি কোম্পানির শেয়ার সংগ্রহ করা উচিত।