একসময়ের চিনি উৎপাদনে সেরার সেরা বিহারে ফের ঘুরবে চিনিকলের চাকা! বন্ধ থাকা ৯টি মিল চালুর বড় উদ্যোগ সরকারের!

একসময় বিহার দেশের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদনকারী রাজ্য হিসেবে বিবেচিত হতো এবং রাজ্যের অর্থনীতিতে আখ ও চিনি শিল্পের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি অবহেলা, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং নানা আর্থিক সংকটের জেরে বিহারের চিনিকলগুলো একে একে বন্ধ হতে শুরু করে। একসময় দেশের মোট চিনি উৎপাদনের প্রায় ৪০% বিহার থেকে আসলেও, বর্তমানে তা কমে মাত্র ৪%-এ এসে ঠেকেছে। স্বাধীনতার আগে বিহারে ৩৩টি চিনিকল থাকলেও ১৯৮০-এর দশকের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে ২৮-এ দাঁড়ায় এবং পরবর্তীতে প্রায় ১৮টি মিল চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে বিহারের সামগ্রিক অর্থনীতি, স্থানীয় আখ চাষী এবং কর্মসংস্থানের ওপর দারুণ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। তবে বর্তমানে সেই অন্ধকার দিনগুলো পেছনে ফেলে বিহার সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করার এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
জানা গেছে, এই পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়টি এই বছরের নভেম্বর (২০২৬) মাসেই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রথম ধাপে তিনটি বন্ধ চিনিকল—মধুবাণীর সাকরি, দ্বারভাঙার রায়াম এবং গোপালগঞ্জের সাসামুসা—পুনরায় চালু করা হবে এবং এই মিলগুলিতে আখ মাড়াই পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। এছাড়া সরকার মোট নয়টি বন্ধ চিনিকল—যেমন চানপাতিয়া সুগার মিল (পশ্চিম চম্পারণ), বড় চাকিয়া ও মতিহারী চিনিকল (পূর্ব চম্পারণ), সাসামুসা (গোপালগঞ্জ), মারহৌরা (সরণ), মতিপুর (মুজাফফরপুর), সমস্তিপুর, সাকরি এবং রায়ম (দারভাঙা-মধুবাণী অঞ্চল)—চালু করার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই মিলগুলি বন্ধ থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল রাজ্য সরকারের ১৯৮৫ সালের একটি পুরনো আইন, যার ফলে শুধুমাত্র সরকারই এগুলি পরিচালনা করতে পারত এবং জমির মালিকানা হস্তান্তর আটকে ছিল। বর্তমান সরকার সেই আইন সংশোধন করে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে, যার ফলে এখন বেসরকারি সংস্থাগুলি এই মিলগুলি পরিচালনা করতে পারবে।
এই চিনিকলগুলি পুনরায় চালু হলে উত্তর ও মধ্য বিহারের আখ চাষিরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, গোপালগঞ্জ, সরণ, মুজাফফরপুর, সমস্তিপুর, দারভাঙা এবং মধুবাণী—এই আটটি জেলার প্রায় ৩.৩৭ কোটি মানুষের প্রায় ৭৫ শতাংশই কৃষিনির্ভর, ফলে এই অঞ্চলের কৃষকদের আখের ফলন ও আয় দুটোই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। আগে মিল বন্ধ থাকায় কৃষকদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ দিয়ে দূরবর্তী রাজ্য বা জেলায় আখ পাঠাতে হতো, যা এখন আর করতে হবে না। শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নয়টি চিনিকল পুনরায় চালু হলে প্রায় ৯,০০০ মানুষের সরাসরি এবং প্রায় ৪৫,০০০ মানুষের পরোক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। এর পাশাপাশি পরিবহন, প্যাকেজিং এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরাও উপকৃত হবেন। বর্তমানে ইথানল মিশ্রণ ও বায়ো-সিএনজি তৈরির সরকারি নীতির কারণে চিনিকলগুলির গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগামী দিনে বিহারের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।