ফাঁড়ির ভেতরেই বারুদের স্তূপে ভয়াবহ বিস্ফোরণ! ঘুম ভাঙল বিকট শব্দে, কাঠগড়ায় পুলিশ

উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের নীলগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির অন্দরেই উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ বাজি ও বারুদের স্তূপে আচমকা ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। মঙ্গলবার সকালে এই আকস্মিক ঘটনার জেরে গোটা এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাতসকালে পরপর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে চারপাশ। বিস্ফোরণের জেরে আশপাশের কয়েকটি দোকানে আগুন লেগে যায় এবং বেশ কিছু জিনিসপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তবে এই ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর নেই।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত শনিবার নীলগঞ্জের নারায়ণপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ প্রচুর অবৈধ বাজি ও বারুদ উদ্ধার করেছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, উদ্ধার হওয়া এই বিপজ্জনক সামগ্রীগুলি সময়মতো নিষ্ক্রিয় না করে সরাসরি পুলিশ ফাঁড়ির ঠিক পাশের একটি গোডাউনে মজুত করে রাখা হয়েছিল। মঙ্গলবার সকালে আচমকাই সেই গোডাউনে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ শুরু হয় এবং পরপর বাজি ও বারুদ ফেটে যেতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে কুণ্ডলী পাকানো কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আকাশ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ফাঁড়ির যে গোডাউনে এই বাজি ও বারুদ রাখা হয়েছিল, তার ঠিক উপরের তলায় একটি পরিবার বসবাস করে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আতঙ্কিত পরিবারের সদস্যরা দ্রুত বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গোডাউনের ঠিক বাইরে একটি খোলা টিনের ড্রামের মধ্যে প্রচুর বারুদ মজুত করে রাখা ছিল। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, সেই ড্রাম থেকেই আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে আশপাশের সমস্ত জায়গায় তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।

বিস্ফোরণের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায় দমকল বাহিনীর দু’টি ইঞ্জিন। দমকল কর্মীরা দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। কিন্তু চারদিকে প্রচুর বারুদ ছড়িয়ে থাকায় আগুন নেভাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয় তাদের। বিস্ফোরণের অভিঘাতে আশপাশের রাস্তায় নানা জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। বাজির ভয়াবহ আগুন থেকে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি খুচরো দোকানেও আগুন ধরে যায় এবং দোকানগুলির সমস্ত মালামাল সম্পূর্ণ পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

ক্ষতিগ্রস্ত এক দোকানদার ইন্দ্রজিৎ দে জানিয়েছেন, “বাজির আগুন থেকে আমার দোকানের বহু মূল্যবান সামগ্রী নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এমনকি দোকানে গচ্ছিত রাখা নগদ টাকাও পুড়ে গেছে। এই ঘটনার পর আমি মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যস্ত।” অপর এক দোকানদার সুস্মিতা দাস বলেন, “পুলিশ ফাঁড়িতে বাজি বিস্ফোরণ হয়েছে শুনেই আমি দ্রুত দোকানে ছুটে আসি। কিন্তু ততক্ষণে আগুন আমার দোকানটিও গ্রাস করেছে। কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এই মুহূর্তে আমি বুঝে উঠতে পারছি না।”

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার বিষয়ে বারাসতের পুলিশ সুপার জে. মার্সি জানিয়েছেন, “কিছু বেআইনি বাজি ও বারুদ পুলিশ বাজেয়াপ্ত করেছিল। সেগুলি ফাঁড়ির ভেতরেই রাখা ছিল, যা পরবর্তীতে কোনো কারণে ফেটে যায়। বর্তমানে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে এবং এই ঘটনায় সৌভাগ্যবশত কোনো হতাহতের খবর নেই।”

উল্লেখ্য, এর আগে ২০২৩ সালের অগস্ট মাসে নীলগঞ্জ সংলগ্ন দত্তপুকুরের মোচপোল এলাকায় একটি অবৈধ বাজির কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সেই মর্মান্তিক ঘটনায় মোট নয়জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং গোটা রাজ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তরে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সেই ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে উদ্ধার হওয়া বাজি ও তার মজুত সম্পর্কে একাধিক কঠোর সতর্কতামূলক নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল। কিন্তু খোদ পুলিশ ফাঁড়ির ভেতরে সেই নির্দেশ যেভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে, তাতে উদ্ধার হওয়া বাজি ও বারুদের এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ডের পর পুলিশের ভূমিকা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।