বিহারের স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রকল্পে বড় মোড়! জমি অধিগ্রহণের আগেই শুরু হচ্ছে সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা, কী জানাচ্ছে সরকার?

বিহার সরকারের উচ্চাভিলাষী ও যুগান্তকারী স্যাটেলাইট টাউনশিপ পরিকল্পনা এখন তার পরবর্তী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাজ্যের প্রধান ও জনবহুল শহরগুলির চারপাশে সম্পূর্ণ নতুন আধুনিক শহর বা স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার ঐতিহাসিক ঘোষণার পর, এবার সুনির্দিষ্ট জমি অধিগ্রহণের পূর্ববর্তী ধাপ হিসেবে একটি ব্যাপক সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (Social Impact Assessment বা SIA) শুরু করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এই বিশেষ সমীক্ষার মূল লক্ষ্য হলো প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্পের কারণে এলাকার সাধারণ মানুষ ঠিক কী পরিমাণ প্রভাবিত হবেন, তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা কীভাবে বা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তীতে তাঁদের ঠিক কী ধরনের সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা বা সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, এই সমগ্র প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে দেশের প্রচলিত আইনানুগ বিধান ও স্বচ্ছতা বজায় রেখেই পরিচালিত হচ্ছে, যাতে একদিকে যেমন সুউচ্চ মানের আধুনিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তেমনই অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ ও স্বার্থও কঠোরভাবে সংরক্ষিত থাকে।
যেকোনো বড় ধরনের ভূমি অধিগ্রহণের আইনি প্রক্রিয়ার আগে প্রভাবিত মানুষের সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাত্রা গভীরভাবে অনুধাবন করার জন্য একটি সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন অত্যন্ত অপরিহার্য। বিহারের এই উচ্চাভিলাষী স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক এই একই নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। এই বিস্তারিত সমীক্ষাটি বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক ও প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে তথ্য সংগ্রহ করবে। এর মাধ্যমে মূলত পরীক্ষা করা হবে যে প্রস্তাবিত প্রকল্পের দ্বারা অবিকল কতগুলি পরিবার সরাসরি প্রভাবিত হতে চলেছে, তাঁদের দৈনন্দিন আয়ের প্রধান উৎসগুলি কী কী, ঠিক কত সংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষিকাজ কিংবা সরাসরি জমির উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, জমি হারানোর করুণ পরিণতির ফলে তাঁদের সামগ্রিক জীবিকা ও রুটি-রুজিতে কতটা বিরূপ প্রভাব পড়বে, কোনো পরিবারকে সম্পূর্ণভাবে অন্যত্রে বাস্তুচ্যুত হতে হবে কিনা এবং পরিশেষে তাদের জন্য ঠিক কী ধরনের ও কতখানি পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্যাকেজ প্রয়োজন। এই সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে চূড়ান্ত ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রস্তুত করা হবে।
প্রাথমিক ঘোষণার পর এবার সরাসরি জমিয়তে নামার ও বাস্তবায়নের প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়ে গিয়েছে। বিহার সরকার এর আগেই রাজ্যের প্রধান এগারোটি শহরের চারপাশে নতুন নতুন স্যাটেলাইট টাউনশিপ গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা জনসমক্ষে ঘোষণা করেছিল এবং বর্তমানে সেই সমস্ত মেগা প্রজেক্টের জমি-সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলির আইনি কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো এই আধুনিক শহরগুলির ভেতরে বিশ্বমানের নাগরিক সুবিধাসমূহ সুনিশ্চিত করা। এর মধ্যে থাকবে উন্নত মানের প্রশস্ত রাস্তাঘাট, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিশুদ্ধ পানীয় জল, অত্যাধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জল জমার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আধুনিক আবাসিক এলাকা, বাণিজ্যিক হাব এবং যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার আওতায় জমি সরাসরি অধিগ্রহণ এবং জমি একত্রীকরণ বা ল্যান্ড পুলিং—এই উভয় বিকল্প পদ্ধতিই সমানভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই ধরনের উচ্চাভিলাষী স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রকল্পগুলোতে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সবসময়ই একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও প্রধান জটিল সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় জমি কেবল একটি স্থাবর সম্পত্তি বা অর্থনৈতিক সম্পদই নয়, বরং তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ মানুষের জীবিকা নির্বাহের একমাত্র প্রধান উৎস। ঠিক এই কারণেই ভূমি অধিগ্রহণের ফলে অবিকল কতগুলি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা সরকারের পক্ষে আগে থেকেই পরিষ্কারভাবে বোঝা অত্যন্ত জরুরি। স্থানীয় কৃষক ও ভূমিদাতাদের সন্তুষ্ট করতে সরকার জমি দানকারী কৃষকদের অত্যন্ত লাভজনক ও উন্নত মানের প্লট প্রদানের একটি আকর্ষণীয় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর অর্থ হলো, যে নির্দিষ্ট এলাকায় এই নতুন টাউনশিপগুলি গড়ে উঠবে, সেখানকার উন্নত বাণিজ্যিক বা আবাসিক প্লটগুলি থেকে সেই কৃষকরাও সরাসরি আর্থিকভাবে উপকৃত হতে পারবেন। তবুও স্থানীয় বাসিন্দাদের মূল উদ্বেগের বিষয় হলো যে তাঁরা যেন বাজারদর অনুযায়ী সম্পূর্ণ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পান এবং তাঁদের কষ্টার্জিত জীবিকা যেন কোনোভাবেই বিপন্ন না হয়। আর ঠিক এই কারণেই এই সামাজিক প্রভাব সমীক্ষাটিকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান এই মেগা পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাটনার আশেপাশে প্রস্তাবিত দুটি বড় স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রকল্প। প্রথমত, পাটলীপুত্র স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রকল্পটি খোদ পাটনার আশেপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা হবে। এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল বা কোর এলাকার পরিমাণ প্রায় তিন হাজার আট (৩,০০৮) একর, যেখানে সামগ্রিক বিশেষ এলাকার পরিমাণ প্রায় একাশি হাজার সাতশো ত্রিশ (৮১,৭৩০) একর নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিশেষ এলাকাটি মূলত বিহটা সারমেরা অর্থাৎ পাটনা রিং রোড এবং জাট ডুমরি রেল জংশনকে কেন্দ্র করে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে গড়ে তোলা হবে। এই অঞ্চলটিকে ঘিরে একটি সর্বাধুনিক ফিনটেক সিটি, একটি আন্তর্জাতিক মানের স্পোর্টস সিটি এবং অন্যান্য বহু বহুমুখী অবকাঠামোগত প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বিরাট বিনিয়োগের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, হরিহরনাথ স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রজেক্টের বিশেষ এলাকার পরিমাণ প্রায় তেত্রিশ হাজার (৩৩,০০০) একর এবং এর মূল বা কোর এলাকার পরিমাণ প্রায় দুই হাজার (২,০০০) একর করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই দ্বিতীয় প্রকল্পটি দিঘাসনপুর হাইওয়ে, ব্যস্ত হাজিপুর-ছাপড়া হাইওয়ে এবং প্রস্তাবিত পাটনা রিং রোডের সমান্তরালে ও বরাবর বিস্তৃত করা হবে। এখানে আধুনিক শিল্প স্থাপন এবং যোগাযোগ ও পরিবহন-সংক্রান্ত প্রকল্পগুলিকেও অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সমন্বিত করা হচ্ছে।
দেশের বিশিষ্ট নগর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে মনে করেন যে, মেগাসিটিগুলির উপর চাপ কমানোর জন্য এবং বড় শহরগুলোর সঠিক ও পরিকল্পিত সম্প্রসারণের জন্য এ ধরনের স্যাটেলাইট টাউনশিপ প্রকল্পগুলি বর্তমান যুগে একেবারে অপরিহার্য। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের বিশেষজ্ঞ মত হলো যে, জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল একটি সামাজিক বিষয়। শুধুমাত্র কাগজের কলমে জমির সঠিক দাম নির্ধারণ করাই একমাত্র সমাধান নয়, বরং এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির স্থায়ী কর্মসংস্থান, প্রয়োজনীয় সামাজিক অবকাঠামো এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ জীবন নিরাপত্তার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। যদি একটি নিরপেক্ষ ও যথাযথ উপায়ে নিখুঁত সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব হয়, তবে তা উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ জনগণের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হবে।