শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে লাঠিচার্জ কেন? প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডে পুলিশি বাড়াবাড়ি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের তোপ, কড়া বার্তার নেপথ্যে কী?

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং তার জেরে দেশব্যাপী ছাত্র বিক্ষোভের ওপর পুলিশি দমনপীড়ন নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক নিট ও অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কাণ্ডকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকারের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র বিক্ষোভ প্রদর্শনের অপরাধেই কখনোই নির্বিচারে পুলিশি লাঠিচার্জ বা বলপ্রয়োগকে কোনোভাবেই ন্যায়সঙ্গত বা সঠিক বলে প্রমাণ করা যায় না। দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি. মোহনার সমন্বয়ে গঠিত একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী বিশেষ বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্টের সামনে দাখিল হওয়া বেশ কয়েকটি জনস্বার্থ ও অন্যান্য আইনি আবেদন শুনানির সময় এই কড়া মন্তব্য করেন।
উক্ত আবেদনগুলিতে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন লাখ লাখ ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সামিল হয়েছিল, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে পুলিশ বাহিনী বিক্ষোভকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ও নৃশংস বলপ্রয়োগ করেছে। এই প্রসঙ্গেই সর্বোচ্চ আদালত জোরালোভাবে মন্তব্য করেছে যে, পুলিশের তরফ থেকে এই ধরনের যেকোনো বাড়াবাড়ি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগগুলিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত করা উচিত। একই সঙ্গে, সুপ্রিম কোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চ সারা দেশজুড়ে ভবিষ্যতে এই ধরনের জনরোষ ও বিক্ষোভ মোকাবেলার জন্য একটি সর্বভারতীয় স্তরে অভিন্ন পুলিশি কার্যপ্রণালী বা অভিন্ন প্রোটোকল গড়ে তোলার আবশ্যিক প্রয়োজনীয়তার ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছে।
শুনানি চলাকালীন আদালতের সামনে বেঞ্চের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয় যে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যই শান্তিপূর্ণ ও আইনসম্মত উপায়ে প্রতিবাদ করার মৌলিক অধিকার ভারতীয় সংবিধান দ্বারা সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো জমায়েত বা আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস পন্থায় পরিচালিত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত শুধুমাত্র প্রতিবাদ হচ্ছে এই অজুহাতে প্রশাসন কোনোভাবেই বেআইনি বাড়াবাড়ি করতে পারে না। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কোনো স্থানে পুলিশের পক্ষ থেকে মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা বাড়াবাড়ি ঘটে থাকে, তবে তার স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে যে এটি কেবল দিল্লির কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক আঞ্চলিক সমস্যা নয়, বরং সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। সমস্ত রাজ্যে পুলিশি প্রোটোকলে একটি নির্দিষ্ট সামঞ্জস্য থাকা অপরিহার্য। শুধুমাত্র সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছে মানেই পুলিশ নির্বিচারে লাঠিচার্জ করবে—এমন স্বৈরাচারী মনোভাব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তবে একই সঙ্গে বিচারপতির বেঞ্চ সুপ্রিম কোর্টে এই বিক্ষোভে এবং সংঘর্ষে আহত হওয়া কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের পরিবারের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীর আইনি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের আবেদনও সানন্দে মঞ্জুর করেছেন।
এই মামলার শুনানির সময় বিচারপতি বাগচী অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত মন্তব্য করে বলেন যে, সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশকর্মী হোন কিংবা সাধারণ আন্দোলনকারী ছাত্র—যেকোনো মানুষের শারীরিক জখম হওয়া সমানভাবে গভীর উদ্বেগের বিষয়। আদালত প্রকাশ্যে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির কাছে প্রশ্ন রেখে বলেছে যে, এই ধরনের উত্তপ্ত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য পুলিশ বাহিনীকে কেন আধুনিক ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয় না? দায়িত্ব পালনকালে পুলিশকর্মীদের সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত হেলমেট ও প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম থাকা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। আগামী দিনে এই সমস্ত আবেদনগুলির ওপর একসঙ্গে আরও বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
উল্লেখ্য, গত ২০শে জুলাই রাজধানী দিল্লিতে ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’র সর্বভারতীয় নেতৃত্বে ঐতিহাসিক ‘সংসদ চলো’ প্রতিবাদ মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই বিশাল মিছিল চলাকালীন সংসদ ভবন চত্বরে বিক্ষোভকারী ছাত্র-জনতা ও কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে এক তীব্র খণ্ডযুদ্ধ ও সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়। পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিও এবং সংবাদমাধ্যমের ছবিতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছিল যে, ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে অগ্রসর হতে চাওয়া ক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ বাহিনী বেপরোয়া লাঠিচার্জ এবং মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল, যা নিয়ে বর্তমানে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে শোরগোল পড়ে গেছে।