৪৪ কোটির মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত সুরাতের হিরে ব্যবসায়ী! ৩ মাস পর মালি থেকে মিলল স্বস্তির খবর

পশ্চিম আফ্রিকার সংঘাতময় দেশ মালিতে সোনার খনি কিনতে গিয়ে অপহরণের শিকার হওয়া গুজরাতের সুরাতের ৭৫ বছর বয়সি বিশিষ্ট হিরে ব্যবসায়ী ধীরু রামানি অবশেষে দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় পর অক্ষত অবস্থায় মুক্তি পেয়েছেন। তবে এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য তাঁর পরিবারকে চোলাই করতে হয়েছে বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি। অপহরণকারীরা প্রথমে ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১০০ কোটি টাকা বা ১০ মিলিয়ন ইউরোরও বেশি মুক্তিপণ দাবি করলেও, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ ও স্নায়ুক্ষয়ী দরাদরি এবং একটানা তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত ৪ মিলিয়ন ইউরো অর্থাৎ ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৪ কোটি টাকার বিনিময়ে তাঁকে মুক্তি দিতে রাজি হয় অপহরণকারীরা। সেই বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণের অর্থ দুর্বৃত্তদের হাতে পৌঁছানোর পরেই গত সপ্তাহে তাঁকে বন্দি দশা থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে মুক্তি পেলেও তিনি এখনই নিজের দেশে বা আমেরিকায় ফিরতে পারছেন না, কারণ মালি ছাড়ার আগে স্থানীয় পুলিশের একটি বিশেষ দল অপহরণের সমগ্র ঘটনা নিয়ে তাঁকে দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করছে এবং তিনি এখনও মালির মাটিতেই আটকে রয়েছেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব মিটলেই তিনি মার্কিন মুলুকে তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে যাবেন বলে জানা গিয়েছে।
পরিবারের সূত্র মারফত প্রাপ্ত তথ্যে জানা গিয়েছে যে, ধীরু রামানির জন্ম গুজরাতের আমরেলি জেলার এক সাধারণ ধর গ্রামে এবং সেখানেই তাঁর জীবনের প্রাথমিক কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। এরপর ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি উন্নত ভবিষ্যতের আশায় আমেরিকায় পাড়ি দেন এবং সেখানে প্রথমে বিভিন্ন ছোটখাটো ব্যবসার পর শেষমেশ হীরের জমজমাট ব্যবসায় নিজেকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ধীরে ধীরে তাঁর হিরের ব্যবসা আন্তর্জাতিক স্তরে প্রসার লাভ করে এবং তাঁর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যও পাকাপাকিভাবে মার্কিন মুলুকেই বসবাস শুরু করেন। প্রবীণ এই ব্যবসায়ী সাধারণত আমেরিকা থেকেই তাঁর সমস্ত ব্যবসা পরিচালনা করতেন। সম্প্রতি তিনি আফ্রিকার দেশ মালিতে একটি লাভজনক সোনার খনি ক্রয় করেছিলেন এবং আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। সেই ব্যবসায়িক সূত্রে এবং সোনার খনির কাজ তদারকি করতেই তিনি কয়েক মাস আগে মালির রাজধানী বামাকোয় গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর কিছুদিনের মধ্যেই চলতি বছরের এপ্রিল মাস নাগাদ তাঁর পরিবারের কাছে আচমকাই অপহরণের খবর এসে পৌঁছায়, যা গোটা পরিবারকে গভীর দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়।
বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ধীরু রামানিকে অপহরণ করার ঠিক আগেই ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা বার্তা বা অ্যাডভাইজরি জারি করা হয়েছিল। সেই সরকারি সতর্কবার্তায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, মালির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতীয় নাগরিকদের ওপর অপহরণের মতো বড় ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করার আগেই ওই প্রবীণ হিরে ব্যবসায়ী অপহরণের ফাঁদে পা দেন এবং দুর্বৃত্তদের বন্দিদশায় চলে যান। তিন মাস ধরে চলা এই শ্বাসরুদ্ধকর বন্দিদশার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণের বিনিময়ে তাঁর মুক্তি মিললেও, আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র এবং আফ্রিকার খনি অঞ্চলে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।