“ছেলের কাজের জন্য বাবা কেন দায়ী হবে?” মেয়ের কাণ্ড দেখেও মন্ত্রীর ঢাল হলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা!

অসমের মন্ত্রিসভার একজন সিনিয়র সদস্য, আর তাঁরই নিজের রক্তমাংসের সন্তান সরাসরি কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য রাজপথে বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন! শুধু তাই নয়, খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও স্লোগান তোলার অভিযোগ উঠল তাঁর বিরুদ্ধে। এই অভূতপূর্ব ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন সমগ্র অসম তথা জাতীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও শোরগোল তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ই সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উদার সুরে এক তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করে সকলের নজর কেড়েছেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। মুখ্যমন্ত্রীর সাফ ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো, একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান বা মতাদর্শের জন্য তাঁর বাবা-মাকে কখনোই দায়ী করা উচিত নয়। তাই অসমের বর্তমান মন্ত্রী কেশব মহন্তকে এই অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য অকারণে আক্রমণ বা রাজনৈতিক কটাক্ষ করা কোনোভাবেই উচিত হবে না।

এই রাজনৈতিক বিতর্কের মূল সূত্রপাত হয়েছিল গত বৃহস্পতিবার। দেশজুড়ে নিট (NEET) পরীক্ষার নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট প্রশ্নফাঁস বিতর্ক এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবধারিত ইস্তফার জোরালো দাবিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার গুয়াহাটির বুকে এক বড়সড় বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। আর সবথেকে অবাক করা বিষয় হলো, সেই জমায়েত ও বিক্ষোভে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে অংশ নেন খোদ অসম গণ পরিষদের (এজিপি) শীর্ষ নেতা তথা রাজ্যের বর্তমান রাজস্ব ও বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের হেভিওয়েট মন্ত্রী কেশব মহন্তের নিজ কন্যা দিবিসা মহন্ত।

প্রতিবাদের ওই দিনের বেশ কিছু ভিডিও পরবর্তী সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল হওয়া সেই সমস্ত ভিডিও ফুটেজে দিবিসাকে অত্যন্ত সোচ্চার কন্ঠে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তুলতে এবং খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধেও তীব্র স্লোগান দিতে দেখা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহলে দাবি করা হয়েছে। যদিও সংবাদমাধ্যম বা নিরপেক্ষ সূত্রের পক্ষে ওই ভিডিওগুলির সত্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তবে এই সমস্ত ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য ও সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অন্দরেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে যে, শাসক জোটের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর মেয়ে কীভাবে সরাসরি এমন সরকার-বিরোধী আন্দোলনে সামিল হতে পারেন? এই রাজনৈতিক উত্তাপের আবহে শনিবার বিষয়টি নিয়ে সম্পূর্ণ খোলামেলাভাবে মুখ খোলেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে, মন্ত্রী কেশব মহন্তকে তাঁর মেয়ের এমন বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য কোনোভাবেই আক্রমণ বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোল করা উচিত। একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের রাজনৈতিক মতাদর্শ, চিন্তা কিংবা পছন্দ তাঁর বাবার রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে নাও মিলতে পারে।”

নিজের ব্যক্তিগত পরিবারের উদাহরণ টেনে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আরও বলেন, “উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আগামী দিনে আমার নিজের ছেলে যদি বড় হয়ে একজন আইনজীবী হয়, তা হলে সে এমন কোনো আসামির পক্ষেও আদালতে সওয়াল করতে পারে, যাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে একেবারেই পছন্দ নাও করতে পারি। তাই প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের স্বাধীন কাজের সঙ্গে বাবা-মায়ের রাজনৈতিক পরিচয়কে জোর করে জুড়ে দেখা একেবারেই ঠিক নয়।”

তবে দিবিসা মহন্তের তোলা বিতর্কিত স্লোগানের সঙ্গে যে তিনি কিংবা তাঁর সরকার ন্যূনতম একমত নন, তাও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী। হিমন্তের সংযোজন, “তিনি জনসমক্ষে যে ধরনের স্লোগান বা বক্তব্য রেখেছেন, তার প্রতি আমার কোনো সমর্থন নেই এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে এর সঙ্গে একমত নই। ভবিষ্যতে যখন তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে, তখন আমি অবশ্যই তাঁর সঙ্গে কথা বলব এবং তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করব যে তিনি জনসমক্ষে যা বলেছেন, তা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না।”

অসমের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রীর এই ভারসাম্যপূর্ণ মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। কারণ, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সরকার বা শাসক দলের বিরুদ্ধে পরিবারের কোনো সদস্যের এহেন বিদ্রোহী অবস্থান প্রকাশ্যে এলে রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং পারিবারিক পরিচয়ের বাইরেও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের এক ভিন্ন চিত্র।

এদিকে, এই গোটা বিতর্ক এবং আলোড়ন সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত মন্ত্রী কেশব মহন্তের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি, অসম গণ পরিষদ (এজিপি) কিংবা বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে মুখ খোলা হয়নি।

তা সত্ত্বেও, দিবিসা মহন্তকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই তাজা বিতর্ক নতুন করে একটি পুরনো ও জটিল প্রশ্নকে আবারও সকলের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামত এবং তাঁদের পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়কে কি কখনো এক সুতোয় বাঁধা উচিত? নাকি গণতন্ত্রের পরিসরে প্রতিটি মানুষের স্বাধীন চিন্তার জায়গা সম্পূর্ণ আলাদা? দিবিসা মহন্তকে ঘিরে চলা এই বিতর্কে আপাতত সেই মৌলিক প্রশ্নটিই অসমের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।