মাসির বাড়ি থেকে ঘরে ফিরছেন জগন্নাথ, কোন বিখ্যাত আচার দেখতে উপচে পড়ে ভিড়?

বিশ্বজুড়ে রথযাত্রার জাঁকজমক ও উৎসবের আমেজ যতটা চর্চায় থাকে, ঠিক ততটাই পবিত্র, তাৎপর্যপূর্ণ এবং আবেগঘন হলো উল্টো রথ বা বাহুদা যাত্রা। রথযাত্রার নির্দিষ্ট দিন কয়েক পরে মহা সমারোহে জগন্নাথদেব, বলরাম ও দেবী সুভদ্রা মাসির বাড়ি (গুণ্ডিচা মন্দির) থেকে নিজেদের মূল ধাম শ্রীক্ষেত্রে ফিরে আসেন।

ওড়িশায় এই পবিত্র প্রত্যাবর্তনকে বলা হয় ‘বাহুদা যাত্রা’ এবং বাংলায় এটি পরিচিত ‘উল্টো রথ’ নামে। এই উল্টো রথের উৎসবকে কেন্দ্র করে রয়েছে নানা ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রাচীন প্রথা এবং বিশেষ মান্যতা।

‘বাহুদা’ কথার অর্থ ও রথের দড়ির মাহাত্ম্য

‘বাহুদা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো প্রত্যাবর্তন। উল্টো রথযাত্রার দিনে জগন্নাথদেবের শ্রীক্ষেত্রে ফিরে আসা কেবল একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা নয়, ভক্তদের বিশ্বাস এই পবিত্র সময়ে মহাপ্রভুর আশীর্বাদ লাভ করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ।

যাঁরা কোনো কারণে মূল রথযাত্রার দিন উপস্থিত থাকতে পারেন না, তাঁরা উল্টো রথের দিন মহাসমারোহে অংশ নিয়ে রথের দড়ি টানেন। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, রথের দড়িতে হাত দেওয়া বা তা টানা মানে নিজের সমস্ত অহংকার, গরিমা বিসর্জন দিয়ে ঈশ্বরের চরণে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা।

পোড়া পিঠে ভোগ ও বিখ্যাত ‘সোনার বেশ’

  • বিশেষ প্রসাদ: বাহুদা যাত্রার একটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মাসির মন্দিরে নিবেদিত বিশেষ প্রসাদ। এই বিশেষ দিনে গুণ্ডিচা মন্দিরে জগন্নাথদেবকে ওড়িশার অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ‘পোড়া পিঠে’ ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, এই প্রাচীন প্রথা ভক্তি, স্নেহ, আতিথেয়তা ও ভালোবাসার এক অনন্য প্রতীক।

  • সোনার বেশ: বাহুদা যাত্রার পরেই পুরীর মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথদেবের অত্যন্ত বিখ্যাত ‘সোনা বেশ’ বা রাজরাজেশ্বর রূপ। এই বিশেষ দিনে মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে সোনা ও হিরের বহুমূল্যবান অলঙ্কারে সুসজ্জিত করা হয়। দেবতাদের এই অপরূপ ও রাজকীয় রূপ দর্শন করতে বিশ্বের কোণ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত পুরীতে ভিড় জমান। ভক্তদের বিশ্বাস, সোনা বেশ ঐশ্বর্য, শক্তি ও দিব্য চেতনার প্রতীক।

উৎসবের শেষ পর্ব: ‘নীলাদ্রি বিজ’ ও রসগোল্লার রহস্য

উল্টো রথে দেবতারা শ্রীক্ষেত্রে মূল মন্দিরে পৌঁছলেই রথযাত্রার উৎসব পুরোপুরি শেষ হয় না। এর একেবারে অন্তিম পর্বে অত্যন্ত আকর্ষণীয় আচার হিসেবে অনুষ্ঠিত হয় ‘নীলাদ্রি বিজ’

পৌরাণিক কাহিনি ও প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী, রথযাত্রার সময় দেবী লক্ষ্মীকে না জানিয়ে বলরাম ও সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে আচমকা রথে চড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন জগন্নাথদেব। এর ফলে দেবী লক্ষ্মী অত্যন্ত অভিমান করেন এবং মূল মন্দিরের দরজা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীতে রথযাত্রা শেষে মন্দিরে ফিরে এসে দেবী লক্ষ্মীর মান ভাঙাতে তাঁকে বিশেষ রসগোল্লা নিবেদন করেন মহাপ্রভু। এই মিষ্টিমুখের মাধ্যমেই দেবীর অভিমান ভাঙে এবং তাঁদের পুনর্মিলন ঘটে। এই পুরো আচারটি মানব জীবনের ক্ষমা, ভালোবাসা, মান-অভিমান এবং সম্পর্কের পুনর্মিলনের এক সুন্দর বার্তা বহন করে।

শুধু পুরী নয়, সর্বত্র উদযাপিত হয় বাহুদা যাত্রা

যদিও ওড়িশার পুরীর বাহুদা যাত্রা বিশ্বজুড়ে সর্বাধিক বিখ্যাত, তবুও পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা সহ সমগ্র ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের জগন্নাথ মন্দিরে উল্টো রথ সমান ভক্তি ও উৎসাহের সঙ্গে উদযাপিত হয়। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, হরিনাম সংকীর্তন, ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় এই পবিত্র দিনটি।

পরিশেষে বলা যায়, রথযাত্রা থেকে শুরু করে উল্টো রথ বা নীলাদ্রি বিজ পর্যন্ত এই দীর্ঘ পক্ষকালব্যাপী উৎসব শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানব জীবনের গভীর এক দর্শন তুলে ধরে। অহংকার বিসর্জন, ক্ষমা, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতাবোধ এবং সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার এই আনন্দই জীবনের প্রকৃত পরিপূর্ণতাকে বারবার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।