লেকটাউনে সাড়ে ৬ কোটি টাকার সোনাসহ গ্রেপ্তার ২! বড়সড় হাওয়ালা চক্রের পর্দা ফাঁস বিধাননগর পুলিশের

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পাঞ্চল তথা বিধাননগর কমিশনারেটের আওতাধীন এলাকায় ফের একবার নজিরবিহীন ও বড়সড় একটি হাওয়ালা চক্রের পর্দা ফাঁস করেছে পুলিশ। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিধাননগর পুলিশের একটি বিশেষ দল অত্যন্ত সফল অভিযান চালিয়ে দুই কুখ্যাত পাচারকারীকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছে। ধৃত ওই দুই ব্যক্তির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় ৪ কেজি ওজনের খাঁটি সোনা, যার বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ছয় কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এই চাঞ্চল্যকর ও সংবেদনশীল তথ্যটি সাংবাদিক বৈঠক করে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার রাঠোর অমিত কুমার ভরত। তিনি গণমাধ্যমকে জানান যে, প্রাথমিক তদন্তে পরিষ্কার হয়ে গেছে এই অবৈধ পাচারের নেপথ্যে অত্যন্ত সুচারুভাবে কাজ করছে একটি বিশাল আন্তঃরাজ্য বা আন্তর্জাতিক হাওয়ালা সিন্ডিকেট।
পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণে জানা গিয়েছে, গতকাল গভীর রাতে লেকটাউন থানা এলাকার ব্যস্ততম বি-ব্লক পার্কের নিকটবর্তী অঞ্চলে নিয়মিত তল্লাশি ও পেট্রোলিং চলার সময় দুই ব্যক্তির গতিবিধি অত্যন্ত সন্দেহজনক ঠেকে। স্থানীয় থানা ও গোয়েন্দা কর্মীদের সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা ওই দুই ব্যক্তিকে জেরা করার উদ্দেশ্যে আটক করেন। এরপর তাদের কাছে থাকা ব্যাগ ও অন্যান্য সামগ্রী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি চালাতেই চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার উপক্রম হয় পুলিশের। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ সোনার বিস্কুট ও বহুমূল্য সামগ্রী। তল্লাশির পর ওই সোনা পরিবহণ বা বহনের পক্ষে বৈধ বা উপযুক্ত কোনো ধরনের নথিপত্র বা কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশ বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে দু’জনকেই তৎক্ষণাৎ গ্রেফতার করে। প্রাথমিক তদন্তের মারফত পুলিশ জানতে পেরেছে যে, ধৃত দুই পাচারকারীই মূলত ভিন রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা। তবে ব্যাপক তদন্তের স্বার্থে এবং অপরাধের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানোর প্রধান কৌশল হিসেবে পুলিশ এই মুহূর্তে অভিযুক্তদের নাম এবং তাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রেখেছে। এই প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সামনে পুলিশ কমিশনার রাঠোর অমিত কুমার ভরত স্পষ্ট করে জানান যে, ধৃতদের পরিচয় ও ছবি এখনই প্রকাশ্যে আনা হলে তাদের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সহযোগীরা সতর্ক ও পলায়নপর হয়ে যেতে পারে, যার ফলে গোটা মামলার মূল তদন্ত প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার আরও যোগ করেন যে, উদ্ধার হওয়া এই বিপুল পরিমাণ সোনা এবং ধৃত দুই অভিযুক্ত ব্যক্তি নিছক কোনো ছোটখাটো অপরাধী নয়, বরং তারা একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শক্তিশালী অপরাধ চক্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এর পেছনে কোনো বড়সড় আন্তর্জাতিক কিংবা শক্তিশালী আন্তঃরাজ্য হাওয়ালা চক্র সক্রিয়ভাবে কলকাঠি নাড়ছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই চক্রের মূল উদ্দেশ্যই ছিল অবৈধ উপায়ে সীমান্ত পার করে বা গোপন পথে নগদ টাকা ও সোনা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া। বর্তমানে ধৃতদের কঠোর পুলিশি হেফাজতে (Police Custody) নিয়ে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া এই সোনা ঠিক কোথায় বা কার কাছে পাচার করার অভিসন্ধি ছিল, কোথা থেকেই বা এই সোনা শহরে আনা হয়েছিল এবং এই হাই-প্রোফাইল চক্রের মূল মাথা বা মাস্টারমাইন্ড কে, তা খুঁজে বের করতে তদন্তের পরিধি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গোটা চক্রের সঙ্গে যুক্ত অন্য সক্রিয় পাচারকারীদের হদিশ পেতে এবং তাদের ডেরা চিহ্নিত করতে জোরদার তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহেই হাড়োয়ার কালিকাপুর এলাকার একটি খারিজি মাদ্রাসা-সংলগ্ন অফিসে যৌথভাবে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা এবং ১৮০ গ্রাম সোনা উদ্ধার করেছিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) ও উত্তরপ্রদেশের অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াড (ATS), যার ফলে পরপর এমন ঘটনায় রাজ্য জুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।