সরাসরি পাতালে লুকিয়েও রক্ষা পেলেন না! প্রাক্তন মন্ত্রী বিরবাহার ঘনিষ্ঠ তৃণমূল ঠিকাদার সোজা পুলিশের জালে

রাজ্যের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই একের পর এক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে আসছে। এবার সরকারি ত্রাণ চুরির এক বিরাট ও গুরুতর অভিযোগে ঝাড়গ্রামের লালগড় এলাকা থেকে গ্রেফতার হলেন এক প্রভাবশালী ঠিকাদার। ধৃত ওই ঠিকাদারের নাম বিপ্লব গোস্বামী। দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপন করে থাকার পর গতকাল রাতে তিনি অত্যন্ত গোপনে নিজের বাড়িতে ফিরেছিলেন। আর ঠিক সেই গোপনীয়তার খবর পৌঁছতেই কালবিলম্ব না করে লালগড় থানার পুলিশ তৎক্ষণাৎ অভিযান চালিয়ে তাঁকে পাকড়াও করে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, শাসকদলের ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে দীর্ঘদিন ধরে গোটা এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব ও দুর্নীতির সাম্রাজ্য তৈরি করেছিলেন এই ঠিকাদার।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মূলত ঝাড়গ্রামের বিনপুর ১ ব্লকের লালগড় এলাকার নেপুরা ১০ নম্বর অঞ্চলের প্রধানের গ্রেফতারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সরকারি ত্রাণ সামগ্রী তছরুপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ওই পঞ্চায়েত প্রধানকে গ্রেফতার করে পুলিশ দীর্ঘক্ষণ জেরা করে। আর সেই জেরা থেকেই ত্রাণের পাহাড় চুরির মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে এই ঠিকাদার বিপ্লব গোস্বামীর নাম প্রধানের মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে। প্রধানের দেওয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই পুলিশ বিপ্লব গোস্বামীর বাড়িতে হানা দেয়। পুলিশি তল্লাশি চলাকালীন তাঁর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণ সামগ্রী। উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ত্রিপল, শত শত শাড়ি ও বিভিন্ন পোশাক, রান্নার কাজে ব্যবহৃত হাঁড়ি, কড়াইসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু সামগ্রী।

স্থানীয় সূত্রের জোরালো দাবি অনুযায়ী, এই ধৃত ঠিকাদার বিপ্লব গোস্বামী ছিলেন তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী এক প্রাক্তন মন্ত্রী বিরবাহা হাঁসদার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ। প্রাক্তন মন্ত্রীর সরাসরি হাত মাথার ওপর থাকার সুবাদেই তিনি এলাকায় ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করতেন এবং বেনিয়মের পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি তিনি শাসকদলের ব্লক কমিটির একজন সক্রিয় সদস্যও ছিলেন। জানা গেছে, তাঁর বাড়িতেই নাকি এলাকার বিধায়ক তহবিলের একটি অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত রাখা থাকত। রাজ্যে পালাবদলের হাওয়া বইতেই এতদিন তাঁর কোনো হদিস মিলছিল না এবং তিনি আত্মগোপন করে ছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। গতকাল রাতে গোপনে বাড়ি ফেরার খবর পুলিশি কান পর্যন্ত পৌঁছতেই পুলিশ সুপার ও থানা যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করে।

আজ ধৃত বিপ্লব গোস্বামীকে কঠোর পুলিশি নিরাপত্তায় ঝাড়গ্রাম জেলা আদালতে তোলা হয়েছে। আদালতের বাইরে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা এবং একাধিক ঝাঁঝালো প্রশ্নের সামনে পড়লেও ধৃত ঠিকাদার অবশ্য একটি শব্দও খরচ করেননি, মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। পুলিশ সূত্রের খবর, উদ্ধার হওয়া এই সমস্ত সরকারি ত্রাণ সামগ্রী ঠিক কোথা থেকে এবং কোন চক্রের মাধ্যমে সেখানে পৌঁছাল, আর এই বিশাল দুর্নীতির পেছনে তাঁর সঙ্গে আর কারা কারা সরাসরি জড়িত রয়েছে, তা জানতে তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।

এই হাইপ্রোফাইল গ্রেফতারির পরই রাজ্যের শাসকদলের দুর্নীতি নিয়ে ফুঁসে উঠেছে বিরোধী শিবির। ঝাড়গ্রামের বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মীকান্ত সাউ এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক সুরে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ঝাড়গ্রাম জেলার যেকোনো দলের নেতা হোক কিংবা কোনো প্রভাবশালী প্রাক্তন মন্ত্রীই হোক, যাঁরা অতীতে সরকারি ত্রাণ ও জনগণের টাকা মেরে দুর্নীতি করেছেন, তাঁদের কাউকেই একচুল ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি সে যেই হোন না কেন—গোস্বামী হোক কিংবা হাঁসদা হোক। অভিযুক্তরা যতই পাতালে লুকিয়ে থাকুক না কেন, গর্ত খুঁড়ে তাদের বাইরে টেনে নিয়ে আসা হবে। আইনসম্মত উপায়ে সাংবিধানিক নিয়ম মেনে আদালতে তোলা হবে এবং কঠোরতম শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। রাজ্যের দুর্নীতিগ্রস্ত ও তোলাবাজ চক্রের সঙ্গে যুক্ত কাউকেই ছাড়বে না প্রশাসন।”