‘বিক্ষোভে যাব না, ঘরে পড়ে ইতিহাস গড়ব!’ হারের মুখে দাঁড়িয়ে কীভাবে বাজিমাত করলেন নিটের দুই কৃতি ছাত্র?

দেশজুড়ে নিট (NEET UG 2026) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রশাসনিক অনিয়মের জেরে যখন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী রাজপথে নেমে তুমুল বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল, ঠিক সেই চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মাঝেই নিজেদের অধ্যবসায় এবং মানসিক জোরের জোরে অনন্য ইতিহাস গড়েছেন এই পরীক্ষার সর্বভারতীয় স্তরের শীর্ষস্থানীয় দুই কৃতি শিক্ষার্থী। এই বছর নিট ইউজিতে সারা দেশে প্রথম স্থান অধিকার করা আরিয়ান গুপ্ত এবং দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী পানশুল বনসাল দেশের এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেদের সংগ্রামের দুর্লভ অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের পেছনের গল্প সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। পরীক্ষা বাতিল এবং পুনরায় পরীক্ষার মতো মানসিক চাপকে কীভাবে তাঁরা সাফল্যের সিঁড়িতে রূপান্তরিত করেছিলেন, তার এক বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে তাঁদের মুখে।

প্রথম স্থান অর্জনকারী আরিয়ান গুপ্ত জানিয়েছেন যে, যখন প্রথম পরীক্ষার ফল বাতিল হওয়ার খবর তাঁর সামনে এসেছিল, তখন তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং অত্যন্ত হতাশ হয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলেন। তবে সেই হতা্তাকে বেশিদিন নিজের মনের ওপর চেপে বসতে দেননি তিনি। আরিয়ান বলেন, “প্রথমে আমি ভীষণ হতাশ হয়েছিলাম কারণ আমি সত্যিই ভেঙে পড়েছিলাম। পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর আমি অনেক কেঁদেছিলাম, কিন্তু শীঘ্রই আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে কেবল কাঁদলে চলবে না, আমাকে পড়াশোনায় আবার মনোযোগ দিতেই হবে।” তিনি আরও জানান যে, তিনি একা এই কষ্টের মুখোমুখি হননি, বরং দেশের প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থী একই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি পরের দিন থেকেই নতুন উদ্যমে দ্বিগুণ প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন।

আরিয়ানের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক সুশিক্ষিত ও চিকিৎসাবিদ পরিবারের নিখাদ সমর্থন। আরিয়ানের বাবা ড. শচীন গুপ্ত পেশায় একজন খ্যাতনামা অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এবং তাঁর মা ড. রেনু গুপ্ত একজন অভিজ্ঞ স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। এছাড়া তাঁর বড় ভাই দিল্লির মর্যাদাপূর্ণ মৌলানা আজাদ মেডিকেল কলেজ (MAMC) থেকে বর্তমানে ডাক্তারি পড়াশোনা করছেন। নিজের এই অসামান্য সাফল্যের সমস্ত কৃতিত্ব নিজের পরিবার, ভাই এবং শিক্ষকদের উৎসর্গ করে আরিয়ান জানান যে, চরম মানসিক সংকটের দিনে তাঁদের নিরলস উৎসাহ এবং গাইডেন্স না থাকলে এই উচ্চ শিখরে পৌঁছানো তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না।

অন্যদিকে, দিল্লির গ্রেটার কৈলাশের কে আর মঙ্গলম ওয়ার্ল্ড স্কুলের কৃতি ছাত্র এবং নিট ইউজির পুনঃপরীক্ষায় সারা দেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী পানশুল বনসাল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ বেছে নিয়েছিলেন। দেশজুড়ে যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে রাস্তায় নেমে লাগাতার আন্দোলন ও প্রতিবাদ চালাচ্ছিল, তখন পানশুল সেই বিক্ষোভে যোগ না দিয়ে নিজের ঘরে বসে পড়াশোনাকেই একমাত্র হাতিয়ার করেছিলেন। পানশুল দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমার মনে হয়েছিল বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার চেয়ে বাড়িতে মনোযোগ দিয়ে পড়া ভালো। আমি আমার কোনো রুটিন বা সময়সূচী বদলাইনি। শুধু শেষ দেড় মাস নিজের সর্বস্ব দিয়ে পরিশ্রম করেছি এবং বাকিটা ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়েছি।”

বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে আরিয়ান গুপ্ত বলেন যে, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও ন্যায়ের পক্ষে। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ করার অধিকার সবারই রয়েছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষা পদ্ধতিতে দ্রুত ব্যাপক সংস্কার আনা হবে। তাঁর মতে, প্রতিটি সিস্টেমেই কিছু না কিছু ত্রুটি থাকে, কিন্তু ভবিষ্যতে যাতে আর কখনো এমন দুর্ভাগ্যজনক প্রশ্নপত্র ফাঁস বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা না ঘটে, তার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক।