মোরাদাবাদে রোমহর্ষক কাণ্ড! গোপনে বিয়ে করতেই এলএলবি ছাত্রীকে খুন করে খালে ভাসাল স্বামী!

উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদ জেলার কাটঘর থানা এলাকায় এক তরুণীর নিখোঁজ হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ ও রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের পর্দাফাঁস করেছে স্থানীয় পুলিশ। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, হায়দ্রাবাদে আইন বা এলএলবি (LLB) ডিগ্রির সুউচ্চ শিক্ষার জন্য অধ্যয়নরত এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কন্যা আদিবা গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে একটি বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার অজুহাতে নিজের বাড়ি থেকে বাইরে পা রেখেছিলেন। কিন্তু তারপরেই পরিবারের সঙ্গে তাঁর সমস্ত যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ কোনো খোঁজখবর না মেলায় অবশেষে কন্যার পরিবার স্থানীয় থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি বা নিখোঁজ ব্যক্তির রিপোর্ট দায়ের করেন। সেই নিখোঁজ তদন্তের সূত্র ধরেই পুলিশ এমন এক লোমহর্ষক সত্যের মুখোমুখি হয় যা সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পুলিশের জোরালো ও সুনির্দিষ্ট ভাষ্যমতে, নিখোঁজ তরুণী আদিবাকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় খুন করা হয়েছে।
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন পুলিশ ও পরিবার যৌথভাবে মেয়েটির ব্যক্তিগত ঘরে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালায়, তখন সেখানে আজমের শরিফের একটি নিকাহনামা, একটি বৈধ বিয়ের রসিদ এবং একটি বিয়ের বিশেষ পোশাক উদ্ধার হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা ঘটনার মোড় সম্পূর্ণরূপে ঘুরে যায়। জানা যায় যে আদিবা তার পরিবারের সম্পূর্ণ অমতে ও অজান্তেই দেবাপুরের বাসিন্দা গুলফাম আলী নামক এক যুবকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে আসার পরই পুলিশ তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু সরিয়ে নিয়ে অভিযুক্ত গুলফামের সন্দেহজনক কার্যকলাপের ওপর কড়া নজরদারি শুরু করে।
তদন্তে উঠে এসেছে যে আদিবা তার স্বামী গুলফামকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। গুলফামই চতুরতার সঙ্গে তার বসবাসের জন্য নয়ডায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিয়েছিল এবং এমনকি চলাচলের জন্য একটি গাড়িও কিনে দিয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আদিলার জীবনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষটিই পরবর্তীতে তাকে নির্মমভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার নৃশংস ষড়যন্ত্র কষেছিল। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৯শে জুন আদিবা দিল্লি বিমানবন্দর হয়ে গোয়া থেকে ফিরে আসেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গুলফাম নিজেই গাড়ি নিয়ে তাকে বিমানবন্দর থেকে অভ্যর্থনা জানিয়ে তুলে আনে। কিন্তু যাত্রাপথে কোনো একটি পারিবারিক বিষয় বা বিবাদকে কেন্দ্র করে তাদের দুজনের মধ্যে তীব্র কথা কাটাকাটি ও তর্কাতর্কি শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, গাড়িটি একটি নির্দিষ্ট টোল প্লাজায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই নরপিশাচ গুলফাম হঠাৎ তার কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র বা পিস্তল বের করে আদিলার কপালে সরাসরি গুলি চালায়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
খুনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করার পর অভিযুক্ত সারারাত ধরে নিথর দেহটি গাড়িতে করেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। এরপর সুযোগ বুঝে সে রুরকি এলাকায় পৌঁছে সমস্ত প্রমাণ চিরতরে লোপাট করার দুরভিসন্ধি নিয়ে মৃতদেহটি একটি গভীর খালে ফেলে দেয়। শুধু তাই নয়, পুলিশের দীর্ঘ হাত এবং সন্দেহ এড়ানোর জন্য সে এক অভিনব ও ধূর্ত কৌশল বেছে নেয়; রামপুরের একটি পুরোনো ফৌজদারি মামলায় নিজের নাম জড়িয়ে খোদ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জেলের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়, যাতে কেউ তাকে এই খুনের ঘটনায় সামান্যতম সন্দেহও না করতে পারে।
তবে অপরাধী যতই চতুর হোক না কেন, পুলিশের ক্ষুরধার বুদ্ধির সামনে শেষ রক্ষা হয়নি। ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে গুলফামের ওপর পুলিশের সন্দেহ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। এরপর আদালতের সুনির্দিষ্ট অনুমতি নিয়ে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে রিমান্ডে এনে কঠোর জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। পুলিশের কড়া জেরার মুখে শেষ পর্যন্ত ভেঙে পড়ে গুলফাম তার নিজ মুখে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কথা অকপটে স্বীকার করে নেয়।
তদন্তে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে যে, গত ৪ঠা জুলাই রুরকি পুলিশ স্থানীয় একটি এলাকা থেকে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীর পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার করেছিল, যাকে সেই সময় শনাক্ত করা না যাওয়ায় বিধি অনুযায়ী দাহ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে মোরাদাবাদ পুলিশের পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিএনএ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তদন্তে নিশ্চিত করা হয় যে ওই উদ্ধার হওয়া মৃতদেহটি আসলে নিখোঁজ আদিবারই ছিল। কাটঘর থানার সুযোগ্য ইন্সপেক্টর শৈলেন্দ্র সিং এবং তার চৌকস তদন্তকারী দলের নিরলস প্রচেষ্টায় এই জটিল ও রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের কুলকিনারা করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে অভিযুক্তের সুনির্দিষ্ট শনাক্তকরণের ভিত্তিতে পুলিশ এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত গাড়ি ও লুকানো পিস্তলটি উদ্ধারের জন্য জোরকদম তল্লাশি চালাচ্ছে এবং ধৃতের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।