হরমুজের পর এবার লোহিত সাগরে ভয়ংকর নৌ অবরোধ! ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় বিশ্ব বাণিজ্য বাজারে চরম আতঙ্ক!

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত কৌশলগত লোহিত সাগর এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালী নিয়ে নতুন করে চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের মিত্রদের লাগাতার হুমকি ও আগ্রাসী পদক্ষেপে বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যেই হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল রপ্তানি নিয়ে তীব্র সংকট চলছে। ঠিক এই অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরব উপদ্বীপের অপর প্রান্তে সমুদ্রপথে এক নতুন ও বিপজ্জনক ফ্রন্ট খুলে দিয়েছে। সৌদি আরব এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হুথিরা বাব আল-মান্দেব জলপথে কঠোর ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণা করেছে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারেয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বন্দর ও বিমানবন্দর অবরুদ্ধ রাখার তীব্র প্রতিশোধ হিসেবেই এই নৌ অবরোধের কঠোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। এই ঘোষিত অবরোধ উপেক্ষা করে চলাচলের স্পর্ধা দেখানোর অভিযোগে হুথিরা অত্যাধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে দুটি বিশালাকার সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর সুনির্দিষ্ট হামলা চালানোর চাঞ্চল্যকর দাবি করেছে। এই সশস্ত্র হামলার পরপরই লোহিত সাগরের সংবেদনশীল জলপথ থেকে অন্তত এক ডজনের বেশি তেলবাহী ট্যাংকার হঠাৎ ইউ-টার্ন নিয়ে নিজেদের গতিপথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন তথ্য থেকে পরিষ্কারভাবে জানা গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রবল আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্তকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালী সুয়েজ খালের দিকে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান এবং অপরিহার্য জলপথ। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুট দিয়ে বৈশ্বিক সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ১২ শতাংশ নিয়মিত পরিবহন করা হয়ে থাকে। ইয়েমেনের হোদায়দা উপকূলের অদূরে এই জলপথে হুথিদের ধারাবাহিক ও একের পর এক হামলার ঘটনায় যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস অর্গানাইজেশন (UKMTO) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, সম্প্রতি সৌদি আরবের আল-শাকিক উপকূল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের নিখুঁত আঘাতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যদিও ক্রুদের তৎপরতায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে, তবুও এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থাগুলির রাতের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথি বিদ্রোহীদের কাছে সামুদ্রিক মাইন এবং আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির মতো ধ্বংসাত্মক অস্ত্রশস্ত্রের বড় ভাণ্ডার রয়েছে, যা লোহিত সাগরের বাণিজ্য চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে সম্পূর্ণ সক্ষম। লন্ডনভিত্তিক স্বনামধন্য গবেষণা সংস্থা চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমি বিবিসি নিউজ ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বিদ্রোহীদের পক্ষে পূর্ণাঙ্গ সামুদ্রিক অবরোধ কার্যকর করা সম্ভব না হলেও, সামান্য কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন ও আকস্মিক প্রতীকী হামলাগুলিই বিশ্বজুড়ে সমস্ত আন্তর্জাতিক বীমা প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক নৌপরিবহন কোম্পানি এবং তেল সরবরাহকারী কর্পোরেশনগুলির মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট।

এদিকে, এই নতুন সংঘাতের নেপথ্যে তেহরানের সুদূরপ্রসারী কৌশল কাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইয়েমেন বিষয়ক অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ আনওয়াত আল-আনসি উল্লেখ করেছেন যে, সৌদি আরব সরাসরি ইরানের সঙ্গে বৈরিতায় জড়ানো সচেতনভাবে এড়িয়ে চললেও, তেহরান পরোক্ষভাবে হুথিদের ব্যবহার করে সৌদিদের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে টেনে আনতে চাইছে। বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বাব আল-মান্দেব প্রণালীর গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৬৯ সালে সুয়েজ খাল চালুর পর থেকে এই ১১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩৬ কিলোমিটার প্রশস্ত প্রণালীটি ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যকার সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং ব্যস্ততম বাণিজ্যিক সংযোগপথের রূপ নিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব তাদের ইয়ানবু বন্দর হয়ে এই পথেই কোটি কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পশ্চিমা দেশগুলিতে পাঠিয়ে আসছে। এখন এই জলপথও বন্ধের মুখে পড়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের টালমাটাল পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।