মেক ইন ইন্ডিয়ার বিরাট চমক! আকাশপথে নজরদারি বাড়াতে কোন দুই সংস্থার সঙ্গে হাত মেলাল ডিআরডিও? জানুন চাঞ্চল্যকর তথ্য

ভারতের দেশীয় প্রতিরক্ষা বহরকে বহুগুণ শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ডিআরডিও (DRDO)-র অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ‘আকাশপথে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ’ বা সংক্ষেপে AEW&C Mk-II কর্মসূচি এখন সর্বোচ্চ গতি পেয়েছে। দেশের আকাশসীমার নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে এবং শত্রুর যেকোনো গোপন আগ্রাসন রুখে দিতে এই মেগা প্রকল্পকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ডিআরডিও সম্প্রতি দেশের দুটি স্বনামধন্য শিল্প সংস্থার সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। গত ২২শে জুলাই, ২০২৬ তারিখে নয়াদিল্লিতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরক্ষা সচিব এবং ডিআরডিও চেয়ারম্যান রাজেশ কুমার সিং-এর মহামান্য উপস্থিতিতে এই চুক্তিগুলি সম্পন্ন হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ডিআরডিও মূলত দুটি প্রধান সংস্থার ওপর বড় দায়িত্ব অর্পণ করেছে। প্রথমত, এআই ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস লিমিটেড (AIESL)-এর সঙ্গে ডিআরডিও-র অধীনস্থ ‘সেন্টার ফর এয়ারবোর্ন সিস্টেমস’ বা সিএবিএস (CABS)-এর একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো, সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ ছয়টি এয়ারবাস এ৩২১ (Airbus A321) বিমানকে নিখুঁতভাবে রূপান্তরিত করে বিশেষায়িত সামরিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা। পরবর্তীতে এই রূপান্তরিত বিমানগুলিতেই অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী AEW&C Mk-II রাডার এবং সেন্সর সিস্টেম স্থাপন করা হবে। দ্বিতীয়ত, এই গোটা প্রকল্পের উৎপাদন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের জন্য ‘আদানি ডিফেন্স সিস্টেমস অ্যান্ড টেকনোলজিস লিমিটেড’ (ADSTL)-কে উন্নয়ন ও উৎপাদন অংশীদার বা DcPP হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। এই শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি সংস্থাটি সম্পূর্ণ মিশন সিস্টেমটির ডিজাইন তৈরি, উন্নয়ন এবং উৎপাদনে ডিআরডিও-কে সর্বাত্মক ও পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে।
আসলে এই AEW&C Mk-II হলো ভারতীয় বিমান বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত পরবর্তী প্রজন্মের ‘আকাশের প্রহরী’ তথা একটি শক্তিশালী আকাশবাহিত নজরদারি ও কমান্ড ব্যবস্থা, যা সামরিক মহলে সাধারণত ‘উড়ন্ত কমান্ড সেন্টার’ হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত। এই উন্নত সামরিক ব্যবস্থার বেশ কিছু অসামান্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথমত, এর দূরপাল্লার নজরদারি ক্ষমতা অত্যন্ত প্রবল, যার মাধ্যমে এটি বহুদূর থেকে শত্রুর লুকিয়ে থাকা যুদ্ধবিমান, আক্রমণাত্মক ড্রোন, ক্রুজ মিসাইল এবং যেকোনো ধরনের গোপন আকাশযান খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারবে। দ্বিতীয়ত, এটি দীর্ঘ সময় ধরে একটানা আকাশে ভেসে থেকে নজরদারি চালাতে সম্পূর্ণ সক্ষম। তৃতীয়ত, এতে একটি অতি আধুনিক ও সুরক্ষিত এনক্রিটেড যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা শত্রুর যেকোনো শক্তিশালী জ্যামারের কাছেও এটিকে সম্পূর্ণ অভেদ্য করে তুলবে। চতুর্থত, এটি যুদ্ধক্ষেত্রের রিয়েল-টাইম পরিস্থিতিগত সঠিক চিত্র সরাসরি মূল কমান্ড সেন্টারকে সরবরাহ করতে পারবে।
‘আত্মনির্ভর ভারত’ গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার পথে এই প্রকল্পটিকে অন্যতম একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিএবিএস এবং আদানি ডিফেন্স যৌথভাবে এই এয়ারবাস এ৩২১ বিমানগুলিতে সমস্ত মিশন সিস্টেম নিখুঁতভাবে সংহত করবে। এরপর ভারতীয় বিমান বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে কঠোর ফ্লাইট পরীক্ষা সম্পন্ন করা হবে এবং সামরিক বিমানযোগ্যতা সংক্রান্ত সমস্ত প্রয়োজনীয় শংসাপত্র বা সার্টিফিকেশন অর্জন করা হবে। এই যুগান্তকারী প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তা ভারতীয় বিমান বাহিনীর সার্বিক আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযানের অধীনে সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ এবং দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে বেসরকারি কর্পোরেট সংস্থাগুলির ক্রমবর্ধমান সক্রিয় অংশগ্রহণের এক উজ্জ্বল ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।