বিড়াল পার হওয়া থেকে ছাতা খোলা—কেন আজও বিশ্বের বুকে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এই ৬ আজব কুসংস্কার?

কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাস—শব্দগুলো শুনলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে কালো বিড়ালের রাস্তা পার হওয়া, রাতে নখ না কাটা কিংবা হাঁচি দিলে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ানোর মতো পরিচিত কিছু চিত্র। এই প্রবণতা কেবল আমাদের উপমহাদেশে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তেই ছড়িয়ে রয়েছে অদ্ভুত সব বিশ্বাস। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে দাঁড়িয়েও এই কুসংস্কারগুলো কেন আজও টিকে আছে, তা এক বিস্ময়কর প্রশ্ন। মূলত পারিবারিক শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক অভ্যাসের ফলেই বংশপরম্পরায় এই বিশ্বাসগুলো আমাদের চেতনায় গেঁথে রয়েছে। আসুন জেনে নিই বিশ্বের এমনই ৬টি অদ্ভুত কুসংস্কারের নেপথ্যের কাহিনী।

প্রথমেই আসে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রচলিত রাতে ঝাড়ু না দেওয়ার বিষয়টি। মনে করা হয়, সূর্যাস্তের পরে ঝাড়ু দিলে ঘরের লক্ষ্মী বিদায় নেয় এবং সংসারে আর্থিক টানাটানি শুরু হয়। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাচীনকালে বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে ঝাড়ু দিলে মেঝেতে পড়ে থাকা ছোটখাটো মূল্যবান জিনিস হারিয়ে যাওয়ার ভয় থাকত। সেই সতর্কবার্তাই আজ কুসংস্কারে রূপ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘরের ভেতরে ছাতা খোলাকে চরম অশুভ মনে করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, অতীতে বাড়ির ভেতরে বড় আকারের ছাতা খোলার সময় দুর্ঘটনাবশত কারো আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত। তাই লোকমুখে ছড়ানো সাবধানবাণী ধীরে ধীরে কুসংস্কারে পরিণত হয়েছে।

তৃতীয়ত, ডাইনিং টেবিলে জুতো রাখা নিয়ে ইংল্যান্ডে প্রবল নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই ধারণার মূলে রয়েছে খনি শ্রমিকদের করুণ ইতিহাস। অতীতে কোনো শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারালে তাঁর জুতো শোকের চিহ্ন হিসেবে টেবিলে রাখা হতো। সেখান থেকেই জুতোর সঙ্গে অশুভ ঘটনার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। চতুর্থত, পাখির মল পড়া নিয়ে রাশিয়া ও তুরস্কের মানুষের বিশ্বাস আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যেখানে একে বিরক্তিকর মনে করি, তারা সেখানে একে সৌভাগ্যের সংকেত মনে করেন। তাদের বিশ্বাস, পাখির মল গায়ে পড়া মানেই শিগগিরই অর্থলাভ বা কোনো বড় সুখবর আসার পূর্বাভাস।

পঞ্চমত, রাশিয়ায় দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন বা হ্যান্ডশেক করাকে সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর মনে করা হয়। তারা বিশ্বাস করেন, চৌকাঠে দাঁড়িয়ে হাত মেলালে সম্পর্কের মধ্যে ফাটল বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। তাই করমর্দনের আগে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করাটাই সেখানে নিয়ম। সর্বশেষ ও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে চর্চিত কুসংস্কারটি হলো ‘১৩’ সংখ্যাকে ঘিরে। পশ্চিমের অনেক দেশে হোটেল বা বহুতল ভবনে ‘১৩’ নম্বর তলা বা রুম রাখা হয় না। ১২-এর পরেই সরাসরি ১৪ লেখা হয়। এই সংখ্যাটিকে অশুভ মানার প্রবণতা এতটাই প্রবল যে, ১৩ তারিখ শুক্রবার পড়লে অনেক মানুষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা যাত্রা স্থগিত রাখেন।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কুসংস্কার কেন টিকে আছে তার উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনের গভীরে। অনিশ্চয়তা ও অজানা ভয় কাটাতে মানুষ অনেক সময় এসব অলৌকিক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে। কোনো কাকতালীয় ঘটনার সঙ্গে ভালো বা মন্দ কোনো অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটলে তা পরবর্তীতে প্রথায় পরিণত হয়। যদিও বিজ্ঞান এসব বিশ্বাসের কোনো প্রমাণ দেয়নি, তবুও এগুলো বিশ্বের প্রতিটি সংস্কৃতির ইতিহাসে লোকবিশ্বাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আজও বেঁচে আছে।