হরমুজ প্রণালী কি তবে যুদ্ধক্ষেত্র? ইরানের মোকাবিলায় ১৭,০০০ সেনা কি যথেষ্ট?

হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের প্রভাব বা হরমুজে বিদ্যমান ঝুঁকি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই জলপথকে পুরোপুরি নিরাপদ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে হাজার হাজার সৈন্য এবং বিপুল যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এক বিশাল নৌ অভিযান বা স্থল সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে হরমুজ প্রণালী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং উন্মুক্ত। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাম্প্রতিক হামলার পর এই রুট দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে এবং অধিকাংশ শিপিং কোম্পানি এটিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলা কেবল সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে হয় ধারাবাহিক নৌ-পহরী মিশন চালাতে হবে, না হয় সরাসরি স্থল অভিযানের পথে হাঁটতে হবে।
পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার ভিত্তিতে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০,০০০ স্থলসেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর আগে থেকেই সেখানে ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের প্রায় ৫,০০০ মেরিন সেনা এবং ২,০০০ প্যারাট্রুপার মোতায়েন করা হয়েছে। অর্থাৎ, ট্রাম্প প্রশাসন চাইলে অনতিবিলম্বে ইরানের দোরগোড়ায় ১৭,০০০-এরও বেশি মার্কিন সেনা প্রস্তুত রাখতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল সৈন্যবাহিনী কি ইরানের মতো শক্ত প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ স্থল অভিযানের জন্য যথেষ্ট? বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরটি সম্ভবত ‘না’। একটি তেল ট্যাঙ্কারকে সুরক্ষা দিতে কমপক্ষে দুটি যুদ্ধজাহাজ এবং পাঁচ থেকে দশটি ট্যাঙ্কারের একটি কনভয়ের জন্য প্রায় ১২টি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি প্রয়োজন।
স্থল অভিযান হলো সবচেয়ে বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের সম্ভাব্য আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের প্রায় ১,৯০,০০০ সৈন্যের পাশাপাশি সেখানে নিয়মিত সেনাবাহিনীও সদা প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডেভিড ডেস রোচেস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে স্থল আক্রমণ চালানো হলে মার্কিন সেনারা চারপাশ থেকে অতর্কিত আক্রমণের শিকার হতে পারে, যা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
পরিশেষে, হরমুজ প্রণালীতে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল অভিযান হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকে এই পথটি অত্যন্ত দুর্গম, আর তাই পেন্টাগন এখন প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করছে। একদিকে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের সামরিক প্রস্তুতি—এই দ্বন্দ্বে হরমুজ প্রণালী বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উত্তপ্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।