রথের দিন বৃষ্টি কেন অনিবার্য? বিজ্ঞানের আড়ালে লুকিয়ে কোন অলৌকিক রহস্য, জানলে অবাক হবেন!

জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি বাঙালির আবেগ ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রথযাত্রা মানেই উত্তাল জনস্রোত, রথের দড়িতে হাত দেওয়া এবং তার পাশাপাশি এক অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়ম—রথের দিন অন্তত এক পশলা বৃষ্টি। বছরের পর বছর ধরে মা-ঠাকুমাদের মুখে শোনা এই বিশ্বাস আজও অটুট। আষাঢ়ের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক মনে হলেও, রথের দিনের বৃষ্টিকে ঘিরে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য অলৌকিক কাহিনি ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা। অনেকের কাছেই এটি নিছক জলকণা নয়, বরং দেবতাদের এক বিশেষ আশীর্বাদ।

পৌরাণিক শাস্ত্র অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণের এক বিশেষ রূপ জগন্নাথ দেব যখন মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন, তখন স্বর্গীয় দেবতারা উল্লাসে মেতে ওঠেন। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, রথের চাকা গড়ানোর সময় আকাশ থেকে যা ঝরে পড়ে, তা আসলে গন্ধর্ব ও দেবতাদের করা ‘পুষ্পবৃষ্টি’। সাধারণ মানুষের চোখে যা সাধারণ বৃষ্টিপাত হিসেবে ধরা দিলেও, শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর ‘চৈতন্য চরিতামৃত’-এ এই বৃষ্টিকে ঈশ্বরের প্রতি দেবতাদের পরম ভক্তি ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্য একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী, ভগবান যখন স্বর্গ ছেড়ে মর্ত্যের ভক্তদের দর্শন দিতে রথে চড়েন, তখন তাঁকে বিদায় জানানোর অভিমানে দেবতারা চোখের জল ফেলেন। সেই দেবতারা সেই অশ্রুই নাকি বৃষ্টি হয়ে ধরণীকে সিক্ত করে।

তবে এই অলৌকিক ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এবং রানী গুন্ডিচার পরম ত্যাগ ও নিষ্ঠার এক হৃদয়স্পর্শী ইতিহাস। সত্যযুগে পুরীর জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ শেষ করে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন মন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠার জন্য ব্রহ্মলোকে যাত্রা করেছিলেন, তখন মর্ত্যের হিসাব অনুযায়ী অনেকটাই সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। ফেরার পর তিনি দেখলেন, পৃথিবী সম্পূর্ণ বদলে গেছে এবং কেউ তাঁকে চিনতে পারছে না। অন্যদিকে, এই দীর্ঘ বিচ্ছেদের সময়ে রানী গুন্ডিচা সমস্ত জাগতিক সুখ ত্যাগ করে পরম নিষ্ঠার সাথে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন।

রানী গুন্ডিচার এই কঠিন সাধনা ও ত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে স্বয়ং জগন্নাথ দেব তাঁকে বিশেষ বর দেন। প্রভু প্রতিশ্রুতি দেন, প্রতি বছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত তিনি মাসির বাড়ি অর্থাৎ গুন্ডিচা মন্দিরে অবস্থান করবেন। ভক্তদের বিশ্বাস, মহাপ্রভু যখনই রথে চড়েন এবং রথ থেকে নামেন, তখনই স্বর্গ থেকে পুষ্পবৃষ্টি শুরু হয়। হাজার বছরের এই অটুট বিশ্বাস আজও রথের চাকার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির বুকেও এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করে। বিজ্ঞান একে আষাঢ়ের স্বাভাবিক নিয়ম বললেও, কোটি কোটি ভক্তের মনে এই বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটায় জড়িয়ে থাকে পরমেশ্বরের আশীর্বাদ। রথযাত্রার সেই ভিড়ে ভিজে যাওয়া বৃষ্টির জল যেন ভক্তদের জীবনে নিয়ে আসে নতুন দিশা ও শুদ্ধি।