দীর্ঘ ২০ বছর পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিন! ১ আগস্টের সাহিত্য অনুষ্ঠান ঘিরে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে

দীর্ঘ দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে কলকাতায় ফিরছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট রবীন্দ্র সদনে একটি মৌলবাদ-বিরোধী সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। ২০ বছর আগে ২০০৭ সালে যে পরিস্থিতির মুখে পড়ে তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে। তাঁর এই সফর ঘিরে একদিকে যেমন বাকস্বাধীনতার জয়ের সুর শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে তৈরি হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক বিতর্ক ও মেরুকরণের আশঙ্কা।

তসলিমা নাসরিনের কলকাতায় আসার ঘোষণা হতেই শাসক ও বিরোধী শিবিরে শুরু হয়েছে জোর তরজা। বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে এই সফরকে ‘বাকস্বাধীনতার জয়’ বলে দাবি করা হচ্ছে। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে মৌলবাদের কাছে মাথা নত করার যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তসলিমার এই প্রত্যাবর্তন সেই রাজনীতির অবসানের প্রতীক। রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ও শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এই বিষয়টিকে তাদের আদর্শগত অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবেই দেখছে।

তবে এর বিপরীত চিত্রও স্পষ্ট। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক আখরুজ্জামান লেখিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, “দীর্ঘদিন ধরে তিনি মুসলিম সম্প্রদায় এবং ইসলামি শরিয়ত আইনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত মন্তব্য করে আসছেন। বিজেপি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে এই বিষয়টিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যাতে কলকাতায় সাম্প্রদায়িক বিভেদ ছড়ানো যায়।” তৃণমূলের অভিযোগ, তসলিমা নাসরিনকে সামনে রেখে বিজেপি পরিকল্পিতভাবে মেরুকরণের রাজনীতি শুরু করেছে।

তৃণমূল ছাড়াও ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীও এই ইস্যুটিকে ভিন্ন চোখে দেখছেন। তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে বলেছেন, “সরকার জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ। অন্নপূর্ণা যোজনা, নারী নিরাপত্তা বা সস্তা বিদ্যুতের মতো জনমুখী ইস্যুতে কোনো কাজ না করে, মানুষের নজর ঘোরাতেই তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে মেরুকরণের রাজনীতি করছে সরকার।” সিদ্দিকীর মতে, এটি কেবলই সাধারণ মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তার সমস্যা থেকে দৃষ্টি সরানোর একটি কৌশল।

কলকাতার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদল মানুষ মনে করেন, একজন লেখিকার মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত এবং প্রায় দুই দশক পর তাঁর প্রত্যাবর্তন স্বাভাবিকভাবেই হওয়া উচিত। অন্যথায়, অনেকে ২০০৭ সালের ভয়াবহ হিংসাত্মক ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছেন। ধর্মীয় সম্প্রীতির প্রশ্নে স্পর্শকাতর কলকাতা শহরে এই অনুষ্ঠান কতটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরেও উদ্বেগ রয়েছে।

তসলিমা নাসরিন নিজে এই অনুষ্ঠানকে ‘মৌলবাদের বিরুদ্ধে সাহিত্যিক প্রতিরোধ’ হিসেবে দেখছেন। তাঁর সমর্থকরা এটিকে একজন লেখকের ব্যক্তিগত বিজয় এবং মুক্ত চিন্তার বড় জয় হিসেবেই দেখছেন। কিন্তু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই প্রত্যাবর্তন যে নতুন করে রাজ্যে বড় ধরনের অশান্তির বীজ বপন করতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ১ আগস্ট রবীন্দ্র সদনের এই অনুষ্ঠান এখন রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাহিত্য ও রাজনীতির লড়াই এক বিন্দুতে মিলেছে।