মঞ্চে ওঠার আগে জুতো খুলে কাঁপতেন লতা মঙ্গেশকর! সুরসম্রাজ্ঞীর অজানা ভয়ে অবাক হৈমন্তী শুক্লা

কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর। তাঁর কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ থাকেন বিশ্বজুড়ে সংগীতপ্রেমীরা। কিন্তু মঞ্চের আলো-ঝলমলে দুনিয়ার আড়ালে এই কিংবদন্তি শিল্পীর মধ্যেও যে এক অস্থির বা উদ্বিগ্ন মানুষের বাস ছিল, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। সম্প্রতি ‘দ্য ওয়াল’-এর সঙ্গে এক একান্ত আড্ডায় লতা মঙ্গেশকরকে নিয়ে এমনই এক চমকপ্রদ ও অজানা স্মৃতির কথা তুলে ধরলেন বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী হৈমন্তী শুক্লা।

হৈমন্তী জানান, লতাজি মানুষ হিসেবে অত্যন্ত লাজুক ও সংযত ছিলেন। খুব কম কথা বলতেন, হাসি কিংবা কথাবার্তা—সবই ছিল খুব মাপা। দীর্ঘ কর্মজীবনে একাধিকবার লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে দেখা করার এবং একই মঞ্চে গান গাওয়ার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল হৈমন্তীর। তার মধ্যে দুর্গাপুরের একটি ‘লতা মঙ্গেশকর নাইট’-এর স্মৃতি আজও তাঁর কাছে অমূল্য সম্পদ।

সেই অনুষ্ঠানের নেপথ্য কাহিনী বলতে গিয়ে হৈমন্তী শুক্লা এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতার কথা ভাগ করে নেন। তিনি জানান, লতাজির সামনে বিভিন্ন ফ্লাস্কে রাখা থাকত গরম জল এবং মিছরি মেশানো গরম জল। সেদিন অনুষ্ঠানের আগে লতাজির গলা খুব একটা ভালো ছিল না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি হৈমন্তীকে অবাক করেছিল, তা হলো সুরসম্রাজ্ঞীর মঞ্চে ওঠার আগেকার নার্ভাসনেস বা উদ্বেগ। লতাজি মঞ্চে ওঠার আগে জুতো খুলে নিতেন এবং তাঁর চোখে-মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠত এক ধরনের চাপা দুশ্চিন্তা।

তবে মঞ্চে ওঠার পর সেই উদ্বেগের রেশমাত্র থাকত না। সুরের জাদুতে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলতেন হাজার হাজার শ্রোতাকে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, অনবদ্য পরিবেশনার পর মঞ্চ থেকে নেমে লতাজি সোজা এসে হৈমন্তীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হৈমন্তী, ঠিক রাহা?” অর্থাৎ, তাঁর গান ঠিকঠাক হলো কি না! এমন একজন কিংবদন্তি শিল্পী যে নিজের গান নিয়ে এতটা আত্মসমালোচক হতে পারেন, তা আজও হৈমন্তী শুক্লাকে বিস্মিত করে।

শিল্পী মানেই কি সবসময় নিজের কাজ নিয়ে এক ধরনের সংশয় বা ভীতি কাজ করে? এই প্রশ্নের উত্তরে হৈমন্তী বলেন, এটিই একজন প্রকৃত শিল্পীর লক্ষণ। শিল্পীদের জীবনে এই অনুভূতি অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রত্যেক শিল্পীই চান নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে। কখনও তা পূর্ণতা পায়, কখনও হয়তো অতৃপ্তি থেকে যায়, কিন্তু সেই নিরন্তর সাধনা ও উৎকর্ষের প্রতি মোহ—এটাই একজন সাধারণ শিল্পীকে কিংবদন্তি করে তোলে।

লতা মঙ্গেশকরের সেই প্রশ্নটি আজও হৈমন্তী শুক্লার কাছে এক বিরাট শিক্ষা। তিনি উপলব্ধি করেন, কোটি মানুষের কাছে যিনি ‘সুরসম্রাজ্ঞী’, তাঁর মনেও মঞ্চে ওঠার আগে এক সাধারণ শিল্পীর মতোই উদ্বেগ কাজ করত। আর সেই উদ্বেগের নেপথ্যে ছিল নিখুঁত হয়ে ওঠার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। এই স্মৃতিচারণ আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়, শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ায় পৌঁছানোর পরেও লতা মঙ্গেশকর নিজেকে সর্বদা এক শিক্ষার্থী হিসেবেই মনে করতেন।