তেলের নিরাপত্তায় বড় পদক্ষেপ ভারতের, হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমাতে নয়া কৌশল

ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদী করতে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ভারত সরকার। কৌশলগত এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন এবং বন্দর প্রকল্প নিয়ে জোরেশোরে কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালীর (Strait of Hormuz) ওপর ভারতের একচ্ছত্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এই রুটটি এড়াতে পারলে ভারতের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটা বিপদমুক্ত হবে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভারত সরকার ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ফুজাইরাহ’ (Fujairah) রুটটি বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে। ওমান সাগরের উপকূলে অবস্থিত এই বন্দরটি ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালীর সংকীর্ণ পথ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে তেল পরিবহণ করা সম্ভব। এতে কেবল পরিবহণ খরচই কমবে না, বরং সামুদ্রিক অস্থিরতার কারণে তেল সরবরাহে সৃষ্ট অনিশ্চয়তাও দূর হবে।
শুধুমাত্র আরব আমিরাত নয়, তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্র সৌদি আরব এবং ইরাকও তাদের তেল রপ্তানির জন্য নতুন নতুন রুট ও লজিস্টিক ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এই দেশগুলোর সাথে ভারতের সমন্বিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে নতুন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক তৈরির পথ সুগম হয়েছে। সৌদি আরব তার পূর্ব উপকূল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা ভারতের জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা সহজতর হবে।
এই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কেবল ভারত ও আরব দেশগুলোর পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ককেই আরও সুসংহত করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে ভারতের দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়িয়ে তুলবে। ভারত বর্তমানে তার চাহিদার বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করে। হরমুজ প্রণালীর মতো ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে বিকল্প পাইপলাইন ও বন্দর ব্যবহারের এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ভারতের ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্ব’ রক্ষার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
প্রতিরক্ষা ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই পাইপলাইন প্রকল্পগুলো ভারতের জন্য একপ্রকার ‘লাইফলাইন’ হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বিঘ্ন ঘটবে না। বর্তমানে ভারতের সরকারি ও বেসরকারি খাতের তেল সংস্থাগুলো এই প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রকল্পগুলো সম্পূর্ণ কার্যকর হলে ভারতের জ্বালানি আমদানি ব্যয় হ্রাসের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে।