কুড়ি বছর পর বাংলায় তসলিমা নাসরিন! রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান ঘিরে তুঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ

দীর্ঘ দুই দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফের বাংলার মাটিতে পা রাখতে চলেছেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্যের রাজনৈতিক অন্দরমহলে প্রবল চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বাংলার মাটিতে পা না রাখা তসলিমার এই আকস্মিক আগমন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং রাজনীতির আঙিনায় নতুন কোনো সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

২০০৪ সালে দেশ ছাড়ার পর থেকে তসলিমা নাসরিন বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেছেন। তাঁর লেখা ও আদর্শ নিয়ে একদিকে যেমন ভক্তদের মধ্যে উন্মাদনা রয়েছে, অন্যদিকে ঠিক ততটাই প্রবল বিরোধিতা রয়েছে রক্ষণশীল গোষ্ঠীর একাংশের। বাম আমলের শেষ দিকে তাঁর প্রস্থান এবং পরবর্তীকালে পালাবদলের পর তৃণমূল সরকারের সময়কালেও তিনি বাংলায় ফেরার সুযোগ পাননি। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, দীর্ঘ ২০ বছর বাদে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠেয় অনুষ্ঠানটির অনুমতিপত্র হাতে পাওয়ার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে মেরুকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদল বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তচিন্তার মানুষ তসলিমার এই প্রত্যাবর্তনকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জয় বলে অভিহিত করছেন। অন্যদিকে, বিরোধীরা এই ইস্যুকে হাতিয়ার করে সরব হয়েছেন। কোনো কোনো মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, বর্তমান সরকারের আমলে এই অনুমতি প্রদানের নেপথ্যে কি কোনো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করছে? আদৌ কি এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে, নাকি এটি স্রেফ একটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—সেই জল্পনা এখন তুঙ্গে।

রবীন্দ্রসদন চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই কঠোর করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। কারণ, অতীতে তসলিমাকে কেন্দ্র করে কলকাতায় যে ধরনের বিক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনও অনেকের মনেই টাটকা। তবে এবারের পরিস্থিতি খানিকটা ভিন্ন। রাজ্যে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তসলিমার প্রত্যাবর্তনকে ইস্যু করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ তুলতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

তসলিমা নাসরিন বরাবরই তাঁর লেখার মাধ্যমে সামাজিক প্রথা ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন। তাঁর এই বাংলা ভ্রমণ নিছকই কোনো সাহিত্যিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, নাকি এর মাধ্যমে তিনি বাংলায় ফের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরতে চাইছেন, তা সময়ই বলবে। রাজনীতির পালাবদলের এই যুগে, তসলিমার এই প্রত্যাবর্তন রাজ্যের শাসক দল ও বিরোধী—উভয় পক্ষের জন্যই একটি কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

সব মিলিয়ে ১ আগস্ট রবীন্দ্রসদনের ওই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে এখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। শহরবাসীর নজর এখন তসলিমার সেই ঐতিহাসিক ফেরার মুহূর্ত এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণের দিকে। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘ ২০ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে তসলিমার এই ফিরে আসা বাংলায় শেষ পর্যন্ত কোনো নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে, নাকি বিতর্ক ও সংঘাতের পুরনো ইতিহাসই পুনরায় আবর্তিত হয়।