রজনীকান্ত-কমল হাসানের নায়িকা, শেষ জীবনে ফুটপাতে কঙ্কালসার দশা! নিশা নূরের মর্মান্তিক পরিণতি

গ্ল্যামার জগতের ঝকঝকে পর্দার আড়ালে যে কতখানি অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে, তার সবচেয়ে নির্মম ও মর্মান্তিক উদাহরণ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার আশির দশকের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নিশা নূর। একসময় যাঁর সৌন্দর্যে বুঁদ ছিল তামাম দক্ষিণ ভারত, যাঁর উপস্থিতি বক্স অফিসে নিশ্চিত করত সাফল্যের নিশ্চয়তা, সেই মানুষটির জীবনের শেষ পরিণতি হয়েছিল অকল্পনীয় এক ট্র্যাজেডি। যে গ্ল্যামারের জন্য তিনি একদা নিজের সবটুকু বিলিয়ে দিয়েছিলেন, চূড়ান্ত দুঃসময়ে সেই জগৎই তাঁকে ছুড়ে ফেলেছিল অবহেলার আঁস্তাকুড়ে।
তামিলনাড়ুর এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা নিশা নূরের অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮০ সালে ‘মঙ্গলা নায়াগি’ ছবির হাত ধরে। নিজের সহজাত অভিনয় প্রতিভা আর রূপের গুণে খুব দ্রুতই তিনি জায়গা করে নেন দক্ষিণ ভারতের চলচ্চিত্র জগতে। রজনীকান্ত, কমল হাসান, মোহনলাল এবং মামুটির মতো মেগাস্টারদের বিপরীতে কাজ করেছেন তিনি। ‘টিক টিক টিক’, ‘আইয়ার দ্য গ্রেট’, ‘দেবসুরাম’-এর মতো কালজয়ী ছবিতে তাঁর অভিনয় আজও দর্শকদের মনে উজ্জ্বল। আশির দশকে যখন তিনি সাফল্যের শিখরে, তখন অনেকেই ভাবেননি যে ভাগ্যের চাকা এতো দ্রুত উল্টো দিকে ঘুরতে পারে।
নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই নিশার জীবনে বিপর্যয় ঘনিয়ে আসে। নতুন মুখের ভিড়ে একের পর এক কাজের সুযোগ হাতছাড়া হতে থাকে তাঁর। শুরু হয় তীব্র আর্থিক সংকট। চলচ্চিত্র জগতের তথাকথিত বন্ধু থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন—সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই চরম অসহায়তার সুযোগ নিয়েছিল তাঁরই চেনা জগতের এক প্রভাবশালী চলচ্চিত্র প্রযোজক। নিশা সেই প্রযোজকের প্রেমের ফাঁদে পা দেন, কিন্তু তা ছিল এক পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা। শোনা যায়, সেই প্রযোজক নিশার সর্বস্ব আত্মসাৎ করে তাঁকে মাঝপথে ফেলে চলে যান।
আর্থিক অভাবের চূড়ান্ত পর্যায়ে একসময়ের এই গ্ল্যামার কুইন জীবনধারণের জন্য দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য হন। এরপর কেটে যায় দীর্ঘ সময়। বহু বছর পর যখন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন তিনি আর আগের নিশা নূর ছিলেন না। তামিলনাড়ুর এক দরগার পাশে ফুটপাতে পড়ে থাকা এক কঙ্কালসার দেহ, অপুষ্টি আর অবহেলায় যাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছিল অসংখ্য ক্ষত। গায়ে পোকা ঘুরে বেড়াচ্ছিল, অথচ চেনার মতো কোনো উপায় ছিল না—ইনিই একসময় পর্দা কাঁপানো নায়িকা। একটি এনজিও তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ডাক্তারদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে, তিনি মারণব্যাধি এইচআইভি/এইডস-এ আক্রান্ত। ২০০৭ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তীব্র যন্ত্রণা আর নিঃসঙ্গতায় শেষ হয় এক স্বপ্নময় জীবনের যাত্রা। নিশা নূরের এই করুণ মৃত্যু বিনোদন জগতের আড়ালে থাকা নিষ্ঠুর সত্যকে বারবার সামনে এনে দাঁড় করায়, যেখানে আলোর বৃত্ত থেকে ছিটকে গেলেই মুছে যায় মানুষের অস্তিত্ব।