অং সান সু চি কি মারা গেছেন? পুত্রের আর্তনাদ ও জান্তার রহস্যময় নীরবতা

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাতে বন্দি গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে বিশ্বের নজর থেকে বিচ্ছিন্ন ৮১ বছর বয়সী এই নেত্রী আদৌ বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর সংশয়। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ দূত—বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাঁর ‘বেঁচে থাকার প্রমাণ’ (Proof of Life) দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

পুত্রের আর্তনাদ ও জান্তার রহস্যময় নীরবতা: সু চির ছেলে কিম আরিস আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর মায়ের বেঁচে থাকার প্রমাণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন। ২০২২ সালের শেষের দিকে শেষবারের মতো জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। এরপর থেকে আইনজীবী বা কোনো কূটনীতিকের সঙ্গেও তাঁকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি তাঁর প্রিয় কুকুর ‘তাইচিতো’-র মৃত্যুতে সু চির পরিবারের দুঃখ আরও প্রকট হয়েছে, কারণ প্রিয় কুকুরটি শেষদিন পর্যন্ত সু চির ফেরার অপেক্ষায় ছিল।

জান্তা প্রধানের ‘ব্যক্তিগত বিদ্বেষ’? চলতি বছরের এপ্রিলে জান্তা দাবি করেছিল, সু চিকে কারাগার থেকে গৃহবন্দি করা হয়েছে। কিন্তু এরপর থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য বা অবস্থান সম্পর্কে আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা তাঁর বিষয়ে জানতে চাইলে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং অত্যন্ত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। বিশ্লেষকদের মতে, সু চির প্রতি জান্তা প্রধানের এই তীব্র বিদ্বেষই তাঁর জীবন নিয়ে আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সু চি কেন জান্তার বড় ভয়ের কারণ? বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সশস্ত্র বিদ্রোহের চেয়ে সু চির ‘অহিংস আন্দোলন’-কে বেশি ভয় পায়।

  • গণআন্দোলনের ভয়: সু চির মুক্তি মিললে বা তাঁর সরাসরি উপস্থিতি পাওয়া গেলে মিয়ানমারের জনগণের ক্ষোভ আরও তীব্র হতে পারে, যা জান্তার ক্ষমতাকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

  • মানবেতর পরিস্থিতি: মিয়ানমারের রাজনৈতিক বন্দি সহায়তা সংস্থার (AAPP) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই কারাগারে চিকিৎসাবঞ্চিত হয়ে ৬০ জনেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দি মারা গেছেন। সু চিও বর্তমানে চরম প্রতিকূল ও মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

লন্ডনের মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলসের মতে, সু চির মতো আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যু গোপন রাখা অসম্ভব হলেও, রাজনৈতিক চাল হিসেবে তাঁকে পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।

বর্তমানে মিয়ানমারে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার রাজনৈতিক বন্দি থাকলেও, সু চির অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বিশ্বজুড়ে এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জান্তা সরকারের এই রহস্যময় নীরবতা কি কোনো বড় অঘটনকে আড়াল করছে?—সেই প্রশ্নই এখন সর্বত্র।