শপিং মলের ‘ডিসকাউন্ট’ যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে বাংলার তাঁতশিল্প? রানাঘাটের প্রাচীন হাটের অস্তিত্ব আজ সংকটের মুখে

বাংলার বস্ত্র শিল্পের ঐতিহ্য এবং অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড হলো গ্রামীণ কাপড়ের হাটগুলো। ভোরের শিশির ভেজা আলোয় যখন এই হাটগুলো জমে ওঠে, তখন তা যেন এক জীবন্ত সংস্কৃতির সাক্ষী বহন করে। আধুনিক প্রজন্মের কাছে ঝাঁ চকচকে শপিং মল এবং অনলাইন শপিংয়ের হাতছানি থাকলেও, আজও বাংলার তাঁতশিল্পীদের কাছে এই হাটগুলোই আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু আধুনিকতার দাপট আর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির জোড়া ফলায় আজ চরম সংকটের মুখে পড়েছে নদিয়ার রানাঘাটের ঐতিহাসিক রামনগর সন্ন্যাসী বাজার।
দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর ধরে এই হাটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, ১৯৯৭ সাল থেকে এই বাজারের যে রূপ তাঁরা দেখেছিলেন, তা আজ বিলুপ্তির পথে। বাজারের এই করুণ পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা দায়ী করছেন সাধারণ মানুষের হাতে নগদের অভাব এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিকে। একসময় রানাঘাট, গেদে, শান্তিপুর, ফুলিয়া এমনকি কালনার মতো দূর-দূরান্ত থেকে পাইকারি ক্রেতা ও বড় বড় শপিং মলের প্রতিনিধিরা এখানে ভিড় করতেন। কিন্তু এখন ছবিটা সম্পূর্ণ বিপরীত। তরুণ ব্যবসায়ী অয়ন বসাক আক্ষেপের সুরে জানান, তাঁর বাবার আমলের সেই জমজমাট হাটের জৌলুস আর নেই। আগে যেখানে উৎসবের মরশুম ছাড়াও বিক্রিবাটা ভালো হতো, এখন শপিং মলের নানা আকর্ষণীয় ‘ডিসকাউন্ট’ এবং চটকদার বিজ্ঞাপনের ভিড়ে সাধারণ ক্রেতারা এই হাট বিমুখ হয়েছেন। আগে যে পরিমাণ আয় হতো, বর্তমানে তা তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ও রবিবার—এই দুই দিন বসে সন্ন্যাসী বাজারের হাট। পাইকারি বিক্রেতাদের একটি অংশের দাবি, রানাঘাট টাউনের নামী শপিং মল ও বড় দোকানদাররা এখনও এখান থেকে পাইকারি দরে মাল কিনে নিয়ে যান ঠিকই, কিন্তু খুচরো ক্রেতার সংখ্যা তলানিতে ঠেকেছে। উৎপাদনের খরচ ও যাতায়াত খরচ তোলাই যেখানে দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে লাভের মুখ দেখা তো দূর অস্ত। হাটের এই পড়তি অবস্থা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, যদি দ্রুত সরকারি কোনো হস্তক্ষেপ বা হস্তশিল্পীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা না করা হয়, তবে অচিরেই হয়তো এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী হাটটি কেবল ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে। আধুনিক অর্থনীতির চাকচিক্যে বাংলার এই কুটির শিল্প আজ ধুঁকছে। অথচ, এই হাটগুলোকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।