বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয় এবং রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসক দলের এই ক্ষমতাচ্যুতি কেবল রাজ্যের রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় বিরোধী জোটের ভবিষ্যতেও বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। এই আবহে সবচেয়ে চমকপ্রদ মোড় নিল সমাজবাদী পার্টি (সপা)-র অবস্থান। কিছুদিন আগেই কালীঘাটে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অখিলেশ যাদব সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “আপনি হারেননি।” কিন্তু সেই রেশ কাটতে না কাটতেই সোমবার একেবারে উল্টো সুর শোনা গেল সপার শীর্ষ নেতা কিরণময় নন্দের গলায়।
সোমবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রাক্তন মৎস্যমন্ত্রী কিরণময় নন্দ রাজ্যের প্রাক্তন শাসক দল ও তৃণমূল নেত্রীর বিরুদ্ধে রীতিমতো তোপ দাগেন। অখিলেশের সৌজন্যমূলক মন্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, “সবচেয়ে বড় ভুল হলো সেখানে, যেখানে বলা হচ্ছে আমি হারিনি। হার স্বীকার করতে না পারাটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অদ্ভুত অস্বস্তি তৈরি করে। মানুষের রায়কে অস্বীকার করার মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা থাকতে পারে না।” এখানেই থেমে থাকেননি তিনি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত পরাজয় নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, “মমতা দু’বারই হেরেছেন।” নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুরের নির্বাচনী বিপর্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, বাস্তবতা থেকে চোখ ফেরানোর কোনো উপায় নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন জোটসঙ্গী দলের নেতার মুখ থেকে এহেন সরাসরি আক্রমণ প্রমাণ করে যে, সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে তৃণমূলের রাজনৈতিক ওজন এখন তলানিতে। সমাজবাদী পার্টি এখন আর তৃণমূলের মতো ‘পড়তি শক্তির’ সঙ্গে একাসনে বসতে স্বচ্ছন্দ নয়। জাতীয় স্তরের বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ নিয়েও চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন কিরণময়। তাঁর কথায়, “আজ যারা বিরোধী জোটের কথা বলছে, তারা নিজেরাই এ রাজ্যে কংগ্রেস ও বামেদের বিধায়ক ভাঙিয়ে দল শক্তিশালী করেছিল।” একে তিনি ‘সোনার পাথরবাটি’-র সাথে তুলনা করেছেন।
রাজনৈতিক কৌশলবিদদের একাংশের মতে, সমাজবাদী পার্টির এই অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য। উত্তরপ্রদেশের মতো বড় রাজ্যে নিজেদের জমি শক্ত করতে সপা এখন তৃণমূলের মতো বিতর্কিত ও ক্ষমতাচ্যুত দলের সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইছে। অখিলেশ যাদব প্রকাশ্যে সৌজন্য বজায় রাখলেও, কিরণময় নন্দকে দিয়ে এই বার্তা দেওয়ানোর অর্থ—জাতীয় রাজনীতিতে তৃণমূলের ওপর থেকে ধীরে ধীরে সমর্থন সরিয়ে নেওয়া। সব মিলিয়ে, এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিল যে, ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বভারতীয় বন্ধু-বৃত্তও এখন প্রবলভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে।





