কলকাতা পুরসভার অন্দরে এখন অস্থিরতার কালো মেঘ। একের পর এক তৃণমূল কাউন্সিলরের গ্রেফতারি এবং স্থানীয় স্তরে জনরোষের মুখে পড়ে কার্যত কোণঠাসা শাসকদল। পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে গিয়েছে যে, রবিবার কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ভবনে ডাকা গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে দল। দলের অন্দরের খবর, অনেক কাউন্সিলরই এখন নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলছেন। আজকের বৈঠকে এক বড় অংশের কাউন্সিলরের অনুপস্থিত থাকার সম্ভাবনা প্রবল ছিল, আর সেই আঁচ করেই শেষ মুহূর্তে বৈঠক স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে তৃণমূলের কাছে সবথেকে বড় প্রশ্ন হলো, কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎ কী? সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে পুনরায় বোর্ড গড়া সম্ভব হবে, নাকি শেষ পর্যন্ত রাজ্য সরকারকে প্রশাসক নিয়োগের পথে হাঁটতে হবে—তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আগামীকাল দুপুরে তৃণমূল কংগ্রেস ভবনে ফের কাউন্সিলরদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের খবর, দিল্লি সফরের ঠিক আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এই বৈঠকে উপস্থিত থাকতে পারেন এবং কাউন্সিলরদের স্পষ্ট বার্তা দিতে পারেন।
গত কয়েক দিনে কলকাতার একাধিক প্রভাবশালী কাউন্সিলর গ্রেফতার হওয়ায় তৃণমূলের মনোবল তলানিতে। গ্রেফতার হওয়া কাউন্সিলরদের তালিকায় রয়েছেন: ১২৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুদীপ পোল্লে (বরো ১৬ চেয়ারম্যান), ১০৬ নম্বর ওয়ার্ডের অরিজিৎ দাস ঠাকুর, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের শচীন সিং, ৪২ নম্বর ওয়ার্ডের মহেশ কুমার শর্মা, ১০১ নম্বর ওয়ার্ডের মুখ্য সচেতক বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্ত এবং ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের জসীমউদ্দীন। এর পাশাপাশি, গত বৃহস্পতিবার রিজেন্ট পার্ক থানায় এক মহিলার শ্লীলতাহানি ও হুমকির অভিযোগে আটক করা হয়েছে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিশ্বজিৎ মণ্ডলকে।
শাসকদলের কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে একের পর এক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি এবং দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের দেখামাত্রই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন এলাকাবাসীরা। এই জনরোষের কারণেই অনেক কাউন্সিলর এখন প্রকাশ্যে আসতে ভয় পাচ্ছেন। দলের নিচুতলার কর্মীদের মধ্যেও চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই সুযোগে পুরসভার ব্যর্থতাকে সামনে রেখে আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কলকাতা পুরসভার অন্দরে যে ভাঙন ধরেছে, তা পূরণ করা তৃণমূলের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে কেন্দ্রীয় এজেন্সির কঠোর নজরদারি, অন্যদিকে কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক স্খলনের অভিযোগ শাসকদলকে এক ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামীকাল বৈঠকে ঠিক কী কৌশল গ্রহণ করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে কলকাতা পুরসভার আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।





