তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে রাজনৈতিক সমীকরণ যেন প্রতিদিন নতুন রূপ নিচ্ছে। বুধবার ৫৮ জন বিধায়ককে নিয়ে বিধানসভায় সাংবাদিক বৈঠকে যে বিদ্রোহের দামামা বাজিয়েছিলেন বহিষ্কৃত বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই তাতে বড়সড় ফাটল দেখা দিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব অস্বীকার করে নতুন ব্লক তৈরির যে দাবি ঋতব্রতরা করেছিলেন, তাতে এখন ভাঙনের সুর। জানা যাচ্ছে, বুধবার সই করা একাধিক বিধায়কই এখন তড়িঘড়ি ‘দিদি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন।
ইটাহারের বিধায়ক মোশারফ হোসেনের বিস্ফোরক দাবি, বিধানসভায় তৃণমূলের নতুন ব্লক থেকে অনেকেই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কালীঘাট নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠদের কাছে আসা ফোন কলগুলিই প্রমাণ করছে যে, বিদ্রোহীদের একাংশ নেত্রীর কাছে ক্ষমা চেয়ে ফিরে আসতে প্রস্তুত। মোশারফের কথায়, “অনেকে বলছেন ভুল বুঝিয়ে সই করানো হয়েছিল। নেত্রী রাস্তায় নামলে সবাই আবার তাঁর ছাতার তলায় ফিরে যাবে।”
ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে তীব্র অনীহা। ঋতব্রতরা বারবার দাবি করছেন, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘পরামর্শদাতা’ হিসেবে চান, কিন্তু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব মানতে নারাজ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থান স্পষ্ট। মমতা ইতিমধ্যে ঋতব্রতকে টিকিট দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন। সিপিএম থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রতকে দলে নিয়ে ভুল করেছিলেন বলে মমতা যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাতে ঋতব্রত শিবিরের ‘পরামর্শদাতা’ তত্ত্ব ধোপে টেকে না।
ইতিমধ্যে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন যে, তাঁর সঙ্গে চারজন বিধায়কের কথা হয়েছে। কুণালের দাবি, মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বা বিভ্রান্ত করে অনেকের সই নেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, “এত বড় বেইমানি করতে তাঁরা রাজি নন, তাই অনেকেই অনুতপ্ত হয়ে যোগাযোগ করছেন।”
বিদ্রোহী শিবিরের প্রথম সারির নেতা সন্দীপন সাহা অবশ্য এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি এটিকে গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করতে কালীঘাটের অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন। সন্দীপনের বক্তব্য, “পায়ের তলার মাটি সরছে বলেই এখন এসব রটনা ছড়ানো হচ্ছে।”
তৃণমূলের অন্দরে এই ‘আসছি-যাচ্ছি’ খেলা আদতে কোন পরিণতির দিকে এগোচ্ছে, তা নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। একদিকে অভিষেক-বিরোধী নতুন মেরুকরণ, অন্যদিকে মমতার প্রতি আনুগত্যের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে বাংলা রাজনীতি এখন এক চরম নাটকের সন্ধিক্ষণে। বিধায়কদের এই দলবদল কি কেবলই কৌশলগত নাকি সত্যিই মমতা-শিবিরে ফেরার ব্যাকুলতা, তা আগামী কয়েকদিনেই স্পষ্ট হবে। আপাতত কালীঘাট বনাম বিদ্রোহী শিবিরের এই স্নায়ুযুদ্ধ তৃণমূলের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে।





