অস্তিত্বের লড়াই নাকি রাজনৈতিক চাল? ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী জনসংখ্যা কমছে কেন? প্রকাশ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য!

ঝাড়খণ্ডের রাজনৈতিক ও সামাজিক আঙিনায় বর্তমানে সবচেয়ে বিতর্কিত ইস্যু হলো আদিবাসী সম্প্রদায়ের ‘ডি-লিস্টিং’ বা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি। যেসব আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যবাহী ধর্ম ও সংস্কৃতি ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম বা ইসলামের মতো অন্য ধর্ম গ্রহণ করেছেন, তাদের তফসিলি উপজাতি (এসটি) তালিকা এবং এর সাথে প্রাপ্ত সমস্ত সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা ও সংরক্ষণ থেকে বাদ দেওয়ার জোরালো দাবি উঠছে।

সারনা সম্প্রদায় মূলত প্রকৃতি উপাসক। বন, পাহাড়, নদী এবং শাল গাছ তাদের উপাসনার কেন্দ্রবিন্দু। প্রথাগত আদিবাসী নেতাদের অভিযোগ, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর আদিবাসী সংস্কৃতি ও রীতিনীতি বজায় রাখা সম্ভব হয় না। এই কারণেই ধর্মীয় কাঠামো ও সংরক্ষণের অধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে ধর্মান্তরিতদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবিটি ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। সম্প্রতি দিল্লির লালকেল্লা ময়দানে অনুষ্ঠিত এক বিশাল আদিবাসী সাংস্কৃতিক সমাবেশেও এই ‘ডি-লিস্টিং’ ইস্যুটি ছিল আলোচনার মূল কেন্দ্রে।

আইআরএস কর্মকর্তা নিশা ওরাওঁ এই দাবিকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, আদিবাসীদের জল, বন ও জমির ওপর অধিকার এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় সুরক্ষিত রাখতেই এই পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, ধর্মান্তরিতরা যদি আদিবাসী কোটায় সুবিধা নিতে থাকেন, তবে মূল সারনা সম্প্রদায়ের সামাজিক কাঠামো ও ঐতিহ্য দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে উঠে এসেছে ‘সারনা ধর্মীয় বিধি’র দাবি। সারনা অনুসারীরা সনাতন ধর্মের সঙ্গে তাদের পার্থক্য স্পষ্ট করে পৃথক ধর্মীয় পরিচয়ের দাবি জানিয়ে আসছেন, যাতে আদমশুমারিতে তাদের পরিচয় হিন্দুধর্মের থেকে আলাদাভাবে নথিভুক্ত হয়।

বিতর্কের আরেকটি বড় দিক হলো সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে পরিবর্তনশীল জনকাঠামো। কিছু সংগঠনের অভিযোগ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও ধর্মান্তরের কারণে এই অঞ্চলে আদিবাসী জনসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ১৯৫১ সালে ঝাড়খণ্ডে আদিবাসী জনসংখ্যা ছিল ৩৫.৮ শতাংশ, যা ২০১১ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২৬.১১ শতাংশে। অন্যদিকে, মুসলিম জনসংখ্যার হার একই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাঁওতাল পরগনায় আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষা নিয়ে এই পরিসংখ্যান এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে এই বিতর্কের বিপরীত মেরুতেও অবস্থান রয়েছে। আদিবাসী গবেষক ও লেখক গ্ল্যাডসন ডুংডুংয়ের মতে, ‘ডি-লিস্টিং’-এর দাবিটি নিছক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি সাফ জানিয়েছেন, আদিবাসীদের চিহ্নিত করা হয়েছিল তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার মানদণ্ডে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়। ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন আদিবাসী ঐক্যকেই নষ্ট করবে বলে তিনি মনে করেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এই ইস্যু কি ঝাড়খণ্ডের আসন্ন নির্বাচনের মেরুকরণ বদলে দেবে? নাকি আদিবাসীদের অধিকার ও ধর্মের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় নতুন কোনো সাংবিধানিক পথ বের হবে? বিতর্ক এখন তুঙ্গে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy