তৃণমূল জমানার ওবিসি-এসসি-এসটি শংসাপত্রে বড় থাবা! জেলাশাসকদের চরম ডেডলাইন দিল নতুন সরকার

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর এবার পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের আরও একটি বড় সিদ্ধান্তের ওপর কার্যত কোপ বসাতে চলেছে নতুন রাজ্য সরকার। ২০১১ সালের পর থেকে রাজ্যে ইস্যু হওয়া সমস্ত এসসি (SC), এসটি (ST) এবং ওবিসি (OBC) জাতিগত শংসাপত্র বা কাস্ট সার্টিফিকেটের রি-ভেরিফিকেশন বা পুনর্যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। শুক্রবার রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের তরফ থেকে সমস্ত জেলাশাসককে (DM) এই বিষয়ে একটি অত্যন্ত কড়া এবং জরুরি নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। নবান্নের এই আকস্মিক পদক্ষেপে রাজ্যজুড়ে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে।

তৃণমূলের দীর্ঘ ১৪-১৫ বছরের শাসনকালে এই জাতিগত শংসাপত্র বিলিবণ্টনের ক্ষেত্রে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে মোটা টাকার বিনিময়ে ভুয়ো সার্টিফিকেট দেওয়ার একাধিক মামলাও হয়েছে। সেই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে এবং অযোগ্যদের চিহ্নিত করে ভুয়ো শংসাপত্রগুলি চিরতরে বাতিল করার লক্ষ্য নিয়েই বর্তমান সরকার এই কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই নতুন শাসকদল পূর্বতন সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছে। এবার তাদের আতশকাঁচের নীচে সরাসরি কাস্ট সার্টিফিকেট সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি।

রাজ্যের আদিবাসী উন্নয়ন এবং অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের নতুন মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু এই বিষয়ে অত্যন্ত কড়া এবং স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “তৃণমূলের আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং অনৈতিক উপায়ে বহু ভুয়ো ও গরমিল থাকা এসসি, এসটি ও ওবিসি সার্টিফিকেট তৈরি করা হয়েছে। এই সব জাল শংসাপত্র ব্যবহার করে অযোগ্যরা বছরের পর বছর ধরে সরকারি চাকরি ও শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছেন।” মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে, অযোগ্যদের হাত থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিয়ে প্রকৃত যোগ্যদের ফিরিয়ে দিতে নতুন সরকার বদ্ধপরিকর।

তবে সরকার শুধুমাত্র ভুয়ো শংসাপত্র বাতিল বা যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্যেই এই অভিযান সীমাবদ্ধ রাখছে না। যে সমস্ত সরকারি আধিকারিক বা ডব্লিউবিসিএস (WBCS) অফিসারদের হাত দিয়ে এই ভুয়ো বা নিয়ম-বহির্ভূত শংসাপত্রগুলি জারি করা হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধেও এবার কড়া আইনি ব্যবস্থার পথে হাঁটছে প্রশাসন। মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে সব আধিকারিকদের তত্ত্বাবধানে এবং স্বাক্ষরে এই ত্রুটিপূর্ণ বা ভুয়ো সার্টিফিকেটগুলি ইস্যু করা হয়েছে, প্রশাসনিক তদন্তে তা প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় পদক্ষেপ এবং ফৌজদারি মামলা করা হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রথম প্রশাসনিক ধাপ হিসেবেই শুক্রবার রাজ্যের সব জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে অবিলম্বে এলাকাভিত্তিক রি-ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

জাতিগত শংসাপত্র নিয়ে রাজ্যে এই জটিলতা বা আইনি লড়াই অবশ্য আজকের নয়। এর আগে কলকাতা হাইকোর্টেও এই ইস্যুতে ব্যাপক ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকারকে। উল্লেখ্য, গত ২০২৪ সালের ২২ মে কলকাতা হাইকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে ২০১০ সালের পর থেকে ইস্যু হওয়া রাজ্যের সমস্ত ওবিসি শংসাপত্র একলহমায় বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল, ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাস কমিশনের ১৯৯৩ সালের আইন বা নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনে ওই বিপুল সংখ্যক শংসাপত্রগুলি দেওয়া হয়নি।

হাইকোর্টের ওই নির্দেশের পর পুরো রাজ্যজুড়ে ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। আদালত তৎকালীন রাজ্য সরকারকে কড়া ভাষায় নির্দেশ দিয়েছিল, নতুন করে নিয়ম মেনে সমীক্ষা চালিয়ে যোগ্য প্রার্থীদের ফের সার্টিফিকেট ইস্যু করতে হবে। সেই নির্দেশ মেনে সেই সময়কার সরকার নতুন করে একটি তালিকা তৈরির কাজও তাড়াহুড়ো করে শুরু করেছিল। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, নতুন তালিকা তৈরির ক্ষেত্রেও পুরোনো গলদ এবং দুর্নীতি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। সেই বিস্তর গরমিলের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা ফের আদালতে গড়ালে, গত ২০২৫ সালের ১৫ জুন কলকাতা হাইকোর্ট পূর্বতন সরকারের তৈরি করা সেই নতুন তালিকার ওপরেও চূড়ান্ত স্থগিতাদেশ জারি করে দেয়। সেই দীর্ঘ আইনি জটিলতা এবং পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগের আবহেই, এবার ২০১১ সালের পর থেকে দেওয়া সমস্ত শংসাপত্রের রি-ভেরিফিকেশনের এই সরকারি সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং নজিরবিহীন বলে মনে করছে রাজ্যের রাজনৈতিক ও ওয়াকিবহাল মহল।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy